আমানুল্লাহ আসিফ, নালিতাবাড়ী (শেরপুর): ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলা আর এপারে গারো পাহাড় অধ্যুষিত বাংলাদেশের শেরপুর জেলা। শেরপুরের গারো পাহাড়ে দাঁড়ালেই দেখা মেলে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন চিত্র।
জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী ৩ উপজেলার গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা ছুটে আসেন। বলতে গেলে সারাদেশের পর্যটককে শেরপুরে টেনে আনে গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য।
গারো পাহাড়ের উঁচু ও ঢালে মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলো হলো- মধুটিলা ইকোপার্ক, গজনী অবকাশ, পানিহাঁটা তারানী পাহাড়, হাড়িয়াকোনা পাহাড়, ভাইরাল আগর বাগান, বারোমারি মিশন, দাওধারা কাটাবাড়ি পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি। এসব স্থানে সারাদেশ এমনকি দেশের বাইরে থেকেও ঘুরতে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। বিশেষ করে শীত মৌসুমে বা ঈদের ছুটিতে ঢল নামে পর্যটকদের। একদিকে যেমন গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশজুড়ে এর সাথে সাথে সরকারের রাজস্ব খাতেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণে অর্থ জমা হচ্ছে।
গারো পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি গারো পাহাড়ের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে বন্যহাতি। এখানকার পাহাড়গুলোতে ৫০-৬০টি হাতির বিচরণ সবসময়ই থাকে। পুরো গারো পাহাড় অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় দুই শতাধিক ছোট-বড় বন্যহাতি রয়েছে। হাতি দেখতেও ভীড় করেন দর্শনার্থীরা।
তবে এসব বন্যহাতি স্থানীয় লোকজনের ফসল ও বাড়িঘরে প্রায়ই তাণ্ডব চালায়। হাতির আক্রমণে মারা যায় মানুষ, ফসল রক্ষায় কৃষকদের দেওয়া বৈদ্যুতিক ফাঁদে মৃত্যু হয় হাতিরও।
এ অঞ্চলে বসবাসকারী গারো, কোচসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও জীবনযাত্রাও পর্যটকদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আনারস, কলা, কমলা, আদা, হলুদ, লটকন ও অন্যান্য পাহাড়ি কৃষিপণ্যও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।
এককথায়, গারো পাহাড়ে স্থাপিত বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক অপার সম্ভাবনা। তবে এসব পর্যটন খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটককে নানা ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সড়ক এখনো সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া উন্নত মানের আবাসন, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পার্কিং, আধুনিক রেস্তোরাঁ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক পর্যটক একদিনের মধ্যেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, হস্তশিল্প ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, গারো পাহাড়ে যেকোনো উন্নয়ন অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় কিংবা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই ইকো-ট্যুরিজমের নীতিমালা অনুসরণ করে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, গারো পাহাড়কে কেন্দ্র করে আধুনিক পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, ডিজিটাল প্রচারণা, নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থানীয় সংস্কৃতিভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করা গেলে শেরপুর দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
সবুজ বাংলা গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আব্দুল আলীম বলেন, 'গারো পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার হয়। যেহেতু সরকার পাবলিক প্লেসে ধুমপান নিষিদ্ধ করেছেন- তাই এসব কেন্দ্রে এটা বন্ধ করা জরুরি।'
গারো পাহাড়ের বড় দুই পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে মধুটিলা ইকোপার্ক ও গজনি অবকাশ কেন্দ্র।
মধুটিলা ইকোপার্ক
মধুটিলা ইকোপার্ক বাংলাদেশের শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় অবস্থিত একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৯৯ সালে এই বনকে পরিবেশ-উদ্যান বা ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রায় ৩৮৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই পার্কে রয়েছে কৃত্রিম লেক, ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য, পিকনিক স্পট এবং শিশুদের খেলার জায়গা। এখানে ২০ একরের ঔষুধী গাছের পাশাপাশি কাঠগাছসহ বিস্তির্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চল রয়েছে।
তবে সম্ভাবনার সাথে সাথে সমস্যাও রয়েছে এই ইকোপার্কে। মধুটিলা ইকোপার্কে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, বন্য হাতির উপদ্রব, পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি, বিনোদন রাইডগুলোর অকেজো অবস্থা, ভালো খাবারের হোটেল ব্যবস্থা নেই এবং রাতে থাকার কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকা। এছাড়াও ছিনতাই ও ইকোপার্ক পাহাড়ে মাদকের আড্ডা, পার্ক সীমান্তে চোরাচালানের অভিযোগে রয়েছে। অতিরিক্ত টিকেট মূল্য আর সংস্কারে বেখেয়ালের কারণে পর্যটক কমছে এই পার্কে।
দর্শনার্থী খন্দকার জান্নাতুল ইসলাম ও সোহানুর রহমান শামীম বলেন, এখানে এসে ভালোই লাগলো। মধুটিলা ইকোপার্কে অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। তবে এগুলো আরো সংস্কার করা প্রয়োজন।
বনবিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, মধুটিলা ইকোপার্ক শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ শিক্ষা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মিলনস্থল। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে বন বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে। আমরা সবাই যদি বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতন হই, তাহলে এই ইকোপার্ক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ সম্পদ হিসেবে টিকে থাকবে। ইকোপার্কে যেসকল সমস্যা রয়েছে এগুলো আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। পার্কের ভেতরে কিছু সংস্কার হয়েছে আরো সংস্কারের জন্য আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। এছাড়াও আমাদের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী এই ইকোপার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা পালন করছেন, যার ফলে সমস্যাগুলো খুব দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করি।
গজনী অবকাশ
গজনী অবকাশ কেন্দ্র হলো শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র। শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ২৮-৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অবকাশ কেন্দ্রটিতে ছোট-বড় টিলা, পাহাড়ি ঝরনা, লেক ও কৃত্রিম জলপ্রপাত রয়েছে। ১৯৯৩ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৯০ একরের এই পর্যটন স্পটটিতে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে প্যাডেল বোট, ঝুলন্ত ব্রিজ, ওয়াচ টাওয়ার এবং শিশু পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা ইত্যাদি। গজনী অবকাশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নিয়মিত সংস্কারের ফলে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলা প্রশাসন এই পর্যটন কেন্দ্রটিকে প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। গজনী অবকাশ কেন্দ্রের ভেতরেই স্থানীয় কিছু খাবারের হোটেল রয়েছে। এখানে পাহাড়ি রান্নার বিশেষ স্বাদের বুনো মুরগির মাংস এবং গারো পাহাড় এলাকার ঐতিহ্যবাহী শুটকি ভর্তা ও পিঠা পাওয়া যায়। এছাড়া সাদা ভাত, দেশি মুরগি, এবং বিভিন্ন পদের দেশীয় ভর্তার সুব্যবস্থা রয়েছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইলে গজনী পার্কের ঠিক পাশেই রয়েছে বনরাণী ফরেস্ট রিসোর্ট। এছাড়া ঝিনাইগাতী উপজেলা ডাকবাংলো বা বনবিভাগের রেস্ট হাউজে আগে থেকে সরকারি অনুমতি নিয়ে থাকা যায়। পর্যটকদের দাবি এখানে থাকার মতো আরো রেস্ট হাউজ বা হোটেল নির্মাণ জরুরি।
দর্শনার্থী হাসান মিয়া, কাওসার, হাবিবুল্লাহ, আনিছুর রহমানসহ আরও কয়েকজন জানান, গজনী অবকাশের সৌন্দর্য দেখে ভালোই লাগলো। এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়। আমরা প্রায়ই আসি।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন দৈনিক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, পর্যটকদের নজর কাড়ার মতো গারো পাহাড়ঘেরা শেরপুর জেলায় অনেক সুন্দর প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের আওতাধীন অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র গজনী অবকাশ। গজনী অবকাশকে আধুনিকায়ন করার জন্য আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। এছাড়াও জেলার সব পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ জেলায় টুরিস্ট পুলিশ না থাকার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেব।
—জা. অর্থনীতি/এনজে