অচল ৪০ কোটি টাকার প্রকল্প, দুর্ভোগে বাগেরহাট পৌরবাসী
ছবি সংগৃহীত

এস এম সামছুর রহমান, বাগেরহাট: বাগেরহাট পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে পৌরবাসীর দোরগোড়ায় নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়াই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।

কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় পুরো কার্যক্রম। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৪ বছর। বর্তমানে অচল হয়ে পড়ে আছে পুরো প্রকল্প। মরিচা ধরছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে, চুরি হয়েছে মূল্যবান সরঞ্জাম। 

অন্যদিকে সুপেয় পানির জন্য এখনও কলসি, বালতি ও ড্রাম হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

জানা গেছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার জন্য নির্মাণ করা হয় আধুনিক পানি সরবরাহ প্রকল্পটি। প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদী থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচাঁদীঘিতে সংরক্ষণ করা হতো।

সেখান থেকে অত্যাধুনিক ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

২০২১ সালের জুন মাসে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক মাস পানি সরবরাহও করা হয়। পরে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় গেলে দেখা যায়, বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে। চুরি হয়ে গেছে রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ বেশ কয়েকটি মূল্যবান সরঞ্জাম। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে সরকারি অর্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।

এদিকে প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌর এলাকার সাধারণ মানুষ।

প্রতিদিন সকাল হলেই অনেককে কলসি, বালতি ও ড্রাম নিয়ে পানির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও আবার পৌরসভার লাইনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক সময় পানি মেলে না।

পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় ৫ থেকে ৬ দিন পরপর পানি আসে। তাও অল্প সময়ের জন্য। ফলে পানি এলেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি। প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে না পারলে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, এমনকি শিশুদের স্কুলে পাঠানো পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা।

পাম্প অপারেটর মতিয়ার রহমান মল্লিক বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে পৌরবাসী নিয়মিত নিরাপদ পানি পেতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নির্মাণ করা হলেও তার কোনো সুফল তারা পাননি। বছরের পর বছর একইভাবে পানির সংকট নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প অচল পড়ে থাকলেও এর দায় কেউ নিচ্ছে না।

বাগেরহাট সুজনের সভাপতি এস.কে. হাসিব বলেন, পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কেন একটি বড় প্রকল্প চালু রাখা গেল না এবং এত সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও মানুষ কেন সেবা পাচ্ছে না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ আবু সাঈদ শুনু বলেন, এটি শুধু একটি পানি সংকট নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতারও প্রশ্ন। জনগণের করের টাকায় নির্মিত একটি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।

অন্যদিকে বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন বলেন, পানি সংকট নিরসনে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি পুনরায় চালু এবং পৌরবাসীর জন্য নিয়মিত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

সরকারি অর্থে নির্মিত প্রায় ৪০ কোটি টাকার এই পানি সরবরাহ প্রকল্প দীর্ঘদিন অচল থাকায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে সুপেয় পানির জন্য প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজার হাজার পৌরবাসীকে। 

তাদের প্রশ্ন—যে প্রকল্পের জন্য এত বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার সুফল তারা কবে পাবেন? আর কলসি হাতে পানির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার এই দুর্ভোগেরই বা শেষ কোথায়?

—জা. অর্থনীতি/এনজে