ঈদের আমেজ নেই হাওরাঞ্চলের কৃষকের ঘরে
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

আশরাফুল ইসলাম তুষার, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল যেন আল্লাহর নিয়ামতে ভরপুর খাদ্যভাণ্ডার। কিন্তু সেই খাদ্যভাণ্ডার এবার উজাড় করেছে অতিভারী বৃষ্টি। এবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় হাওরে কৃষকদের স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়েছে। একমাত্র ফসল হারানোয় হাওরের কৃষক আজ বাকরুদ্ধ। 

এবার এ মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। জেলায় বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয় ১১ লক্ষ ৯৫ হাজার ২৯ মে. টন ধান। সব ফসল ঘরে উঠলে আনুমানিক হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল।

এদিকে আর ১ দিন পর পবিত্র ঈদুল আযহা ঘনিয়ে এলেও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর ঘরে নেই উৎসবের আমেজ। চলতি বোরো মৌসুমে বিএডিসির মিশ্রণ বীজ, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ১৩ উপজেলায় প্রায় ৬০ হাজার কৃষকের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চোখের সামনে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে হতাশায় ভেঙে পড়েছেন কৃষকেরা।

শুধু বন্যাই নয়, বিএডিসির বি ধান-৮৮ মিশ্রণ বীজ নিয়েও চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক কৃষক। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে মারাত্মকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু বোরো ধান নয়, সবজি, মাছ ও অন্যান্য ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। সব মিলিয়ে জেলার কৃষকদের মধ্যে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা।

অনেক কৃষকের আশা ছিল বোরো ধান বিক্রি করে কোরবানির পশু কিনবেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। কিন্তু অকাল বন্যায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।

করিমগঞ্জ উপজেলার পুরান চামড়া গ্রামের কৃষক শাফায়েত মিয়া জানান, অতিবৃষ্টিতে তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কাটা জমির ধান নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ফিশারি পুকুরের মাছেও ভাইরাস ছড়িয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দিই। এবারো ইচ্ছা আছে। কিন্তু কীভাবে দেব, আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের খাবার কোনোভাবে জুটে যাবে, কিন্তু গরুগুলোর কী হবে? এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।

একই উপজেলার সুতারপাড়া গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, ঈদ আসছে, কিন্তু ঘরে কোনো আনন্দ নেই। ছেলে-মেয়েদের নতুন কাপড় কিনে দিতে পারিনি। ধান বিক্রি করতে না পারায় হাতে টাকাও নেই।

নিকলী উপজেলার বেরিবাধ এলাকার কৃষক আবদুল হেলিম বলেন, সব জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। প্রতি বছর কোরবানি দিই, এবারো দেয়ার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করবেন।

একই গ্রামের কৃষক জুয়েল বলেন, প্রতি বছর কোরবানি দিই, এবারো দেবো। ফসল আল্লাহর দান, তিনি নিয়ে গেছেন। কী আর করার আছে।

কটিয়াদি উপজেলার করগাও ইউনিয়নের কৃষক মোবারক মিয়া বলেন, ঋণ করে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। সব পানি নিয়ে যেছে। যেভাবেই হোক কোরবানি তো দিতে হবে।

একই উপজেলার কৃষক রুবেল মিয়া ও আকবর মিয়া জানান, বছরের একমাত্র মাত্র বোরো ফসলের আয়ে তাদের পুরো বছর চলতে হয়। কিন্তু বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। সামান্য কিছু ধান কেটে আনলেও রোদ না থাকায় সেগুলোও নষ্ট হয়েছে। তারা বলেন, আমাদের মতো হাজার হাজার কৃষকের একই অবস্থা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কৃষি প্রণোদনা না পেলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। ঈদের আনন্দের বদলে এখন হাওরাঞ্চলের ঘরে ঘরে বিরাজ করছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় মোট এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই ছিল এক লাখ চার হাজার হেক্টর জমি। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে হাওরের কৃষকরা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখে। ঈদের আনন্দ নয়, তাদের ভাবনায় এখন একটাই প্রশ্ন—পরিবার কীভাবে চলবে, ঋণ কীভাবে শোধ হবে, আর পরের মৌসুমে তারা আবার চাষে ফিরতে পারবেন কি না।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড.সাদিকুর রহমান জানান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে আমরা কৃষকদেরকে মাইংকিং করে ও মসজিদে মসজিদে বলে দিয়েছিলাম যেসকল পাকা ধান অর্ধনিমজ্জিত আছে সেগুলি ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত ধান কাটার জন্য। আমাদের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে গেছেন। কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করতে ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পিআইও-দের দিয়ে কমিটি গঠন করে দেয়া হয়। ওই কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা জেলায় জমা দেন। জেলা থেকে সেগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে প্রকৃত কৃষকরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।

—জা. অর্থনীতি/এনজে