বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে তিন ধাপ পেছালো বাংলাদেশ

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক প্রকাশ করেছে। এই সূচকে গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৫২তম। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৪৯তম অবস্থানে থাকলেও এবার পিছিয়ে যাওয়ার ফলে গত বছরের অর্জিত সাফল্য কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরএসএফের মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোরের অবনতি ঘটায় বাংলাদেশ এখন গণমাধ্যম স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘খুবই গুরুতর’ বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ সূচকে স্কোরের ব্যাপক হ্রাসকে দায়ী করা হয়েছে। আরএসএফ মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক গতিশীলতা এবং নিরাপত্তা—এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব, রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তির চাপ এবং ভিন্নমতের সাংবাদিকতাকে সহ্য করার ক্ষমতার ঘাটতি এই নেতিবাচক অবস্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া জনস্বার্থে রাজনীতিবিদদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম আশানুরূপ সমর্থন পাচ্ছে না বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এই সূচকে বেশ বৈচিত্র্যময়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ১ ধাপ এবং ভারতের চেয়ে ৫ ধাপ এগিয়ে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে। তথ্য অনুযায়ী, নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে ৬৫ ধাপ, শ্রীলঙ্কা ১৮ ধাপ এবং ভুটান ২ ধাপ এগিয়ে রয়েছে। আরএসএফের মতে, সামগ্রিকভাবে প্রশান্ত-মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ছে এবং পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। অনেক দেশ কাগজে-কলমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে তার চরম লঙ্ঘন ঘটছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সামগ্রিক চিত্র এবার বেশ হতাশাজনক। সূচক প্রকাশের গত ২৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক গড় স্কোর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং অর্ধেকের বেশি দেশ ‘কঠিন’ বা ‘খুবই গুরুতর’ শ্রেণিতে পড়েছে। সূচকে টানা ১০ বছরের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে নরওয়ে, অন্যদিকে তালিকার সর্বনিম্নে অর্থাৎ ১৮০তম অবস্থানে রয়েছে ইরিত্রিয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বছরে যুক্তরাষ্ট্র আরও ৭ ধাপ পিছিয়ে ৬৪তম স্থানে নেমে গেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া সরকার বিভিন্ন কঠোর আইন ব্যবহার করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করায় দেশটি ১৭২তম অবস্থানে রয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পর কিছু দেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সিরিয়া অন্যতম। ২০২৪ সালের শেষে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটি ৩৬ ধাপ এগিয়ে ১৪১তম স্থানে উঠে এসেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আরএসএফের সম্পাদকীয় পরিচালক আন বোকান্দে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনগুলো চরমভাবে অবহেলিত হচ্ছে এবং অপরাধীরা দায়মুক্তি পাচ্ছে। গণমাধ্যমের এই নাজুক পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

জেএ/অভি