তিন সংকটে ইউরোপের অর্থনীতি, সামনে কি বড় পতন? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চল ইউরোপ। কিন্তু, সেই ইউরোপই এখন একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে! জ্বালানির বাড়তি খরচ, নিরাপত্তার কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, আর দ্রুত বয়স্ক হয়ে যাওয়া জনসংখ্যা। একদিকে উৎপাদন বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে বাড়ছে সরকারি ব্যয়ের বোঝা। প্রশ্ন হলো, ইউরোপের অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে দিচ্ছে কোনটি? আর এই সংকট কাটিয়ে ইউরোপ কি আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে?

জ্বালানি: উৎপাদন ব্যয়েই প্রতিযোগিতার চাপ!

প্রথম সংকট, জ্বালানি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন থাকলেও চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হয় বিদেশ থেকে আমদানি করে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৫৭ শতাংশ এসেছে নিট আমদানির মাধ্যমে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে ইউরোপের অর্থনীতিতেও।

 

গ্যাস ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এতে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশের উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও কঠিন হয়ে পড়ে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানিবাজারের অনিশ্চয়তা এই চাপ আরও বাড়িয়েছে। ফলে ইউরোপের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু জ্বালানি পাওয়া নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি নিশ্চিত করা।

তবে এই সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে। তাই জ্বালানি বড় সমস্যা হলেও এটিই ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার একমাত্র কারণ নয়।

প্রতিরক্ষা: নিরাপত্তা বাড়ছে, বাড়ছে খরচও!

দ্বিতীয় চাপ, প্রতিরক্ষা ব্যয়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে, সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে দেশগুলো। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার হিসাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় ২০২৫ সালে ছিল ৪১৮ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালে তা ৪৫৪ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে।

এত বড় ব্যয়ের অর্থ হলো, সরকারকে একই সঙ্গে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পেনশন, অবকাঠামো ও উন্নয়নের অগ্রাধিকার সামলাতে হবে। তবে, প্রতিরক্ষা খরচের সবটাই অর্থনৈতিক বোঝা নয়। স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। তাই প্রশ্নটা শুধু কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা নয়; এই বিনিয়োগ ইউরোপের শিল্প ও অর্থনীতিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বয়স্ক জনসংখ্যা: সংকটটা সবচেয়ে গভীরে!

এবার আসা যাক সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে—বয়স্ক জনসংখ্যা। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরো এলাকায় ২০২৫ সালে প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫। ২০৫০ সালে তা বেড়ে ৫১ এবং ২১০০ সালে ৬২ হতে পারে।

সহজ করে বললে, এখন প্রায় তিনজন কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে একজন প্রবীণ থাকলেও ২০৫০ সালে অনুপাতটি নেমে আসতে পারে প্রায় দুজন কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে একজন প্রবীণে। এর প্রভাব পড়বে শ্রমবাজারে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমলে দক্ষ কর্মীর সংকট বাড়তে পারে। একই সময়ে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়লে সরকারি অর্থের ওপর চাপ তৈরি হবে। আর এই জায়গাতেই সংকটটি গভীর। কারণ জ্বালানির দাম কমতে পারে, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ধরনও বদলাতে পারে; কিন্তু জনসংখ্যার বয়সের কাঠামো বদলানো অনেক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

আসল দুর্বলতা: কম উৎপাদনশীলতা!

কিন্তু বয়স্ক জনসংখ্যা থাকলেই যে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে, তা নয়। এখানে আসল প্রশ্ন হলো, কম কর্মী নিয়েও কত বেশি উৎপাদন করা সম্ভব? এখানেই উৎপাদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং নতুন ব্যবসা গড়ে তোলার গতি কম হলে ইউরোপের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। অভিবাসনের মাধ্যমে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের ও বয়স্ক কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো কিছুটা সহায়তা করতে পারে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা না বাড়লে শুধু নতুন কর্মী এনে এই সংকটের পুরো সমাধান সম্ভব নয়।

তাহলে কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে ইউরোপ?

ইউরোপের অর্থনীতি থেমে যায়নি, তবে প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পূর্বাভাসে ইউরো এলাকার প্রবৃদ্ধি চলতি বছর শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এই পূর্বাভাস বলছে, অর্থনীতি এগোবে; কিন্তু গতি খুব বেশি নয়। ইউরোপের সামনে তাই তিনটি বড় কাজ—সাশ্রয়ী ও নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করা, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ধরে রাখা এবং কম কর্মক্ষম মানুষের মধ্যেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।

ইউরোপের অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে কোনো একক সমস্যা নয়। জ্বালানি এখনকার খরচ বাড়াচ্ছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাজেটের অগ্রাধিকার বদলাচ্ছে, আর বয়স্ক জনসংখ্যা তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ। এই তিন চ্যালেঞ্জ সামলে ইউরোপ কতটা উৎপাদনশীল হতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক শক্তি।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি