জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: যুদ্ধ শুরু হয় একটি দেশের মাটিতে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক ধাক্কা পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের বাজারেও। বোমায় ঘরবাড়ি ভাঙে, কারখানা বন্ধ হয়, মানুষ কাজ হারায়। একই সঙ্গে তেল, গ্যাস, খাদ্য ও পরিবহনের দাম বাড়ে। ফলে যুদ্ধ না করা দেশও মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
বর্তমান বিশ্বে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন উত্তেজনা জ্বালানি ও নৌপথের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। সুদানে গৃহযুদ্ধ, মিয়ানমারের সংঘাত এবং কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে সহিংসতায় উৎপাদন, বাণিজ্য ও মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি সংঘাতের ধরন আলাদা, কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত সীমান্ত পেরিয়ে ছড়ায়। লাখ লাখ মানুষ ঘর ছাড়লে আশ্রয়, চিকিৎসা ও খাদ্যের চাহিদা বাড়ে। বাজারে ক্রেতা, শ্রমিক ও উৎপাদক কমে যায়; শরণার্থী সহায়তায় প্রতিবেশী দেশগুলোকেও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
ইতিহাসেও এর উদাহরণ আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ ও এশিয়ার শিল্প, রেলপথ, বন্দর এবং শহর ধ্বংস হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ও বছর লেগেছে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তেল রপ্তানিকারকদের নিষেধাজ্ঞা ও সরবরাহ সংকটে বিশ্বে তেলের দাম বেড়ে যায়। জ্বালানিনির্ভর দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও মন্দার চাপ তৈরি হয়। ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ অর্থনীতিকে প্রথমে আঘাত করে উৎপাদনে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতু, বন্দর ও কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্য তৈরি ও পরিবহন কমে যায়। কৃষক জমিতে যেতে পারেন না, শ্রমিক কাজ হারান, ব্যবসা বন্ধ হয়। সরকারকে তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের বদলে সামরিক ব্যয়, জরুরি সহায়তা এবং পুনর্গঠনে বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। ঋণ বাড়ে, বিনিয়োগ কমে, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়।
এরপর ধাক্কা লাগে বিশ্ববাজারে। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, বিমা ও পরিবহন খরচ বাড়ে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, সার, প্লাস্টিক এবং খাদ্য উৎপাদনও ব্যয়বহুল হয়। বিশ্বব্যাংকের ২৮ অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাতসহ নানা ধাক্কায় এ বছর জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ এবং সামগ্রিক পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি আমদানি, ডলারের চাহিদা, পরিবহন ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে। প্রবাসী আয় বা রপ্তানি বাজারও অস্থিরতায় চাপে পড়তে পারে। অনিশ্চয়তায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প স্থগিত করেন, মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং সরকারকে সুদের বেশি খরচ গুনতে হয়। পরিবার আয়ের বড় অংশ খাবার ও জ্বালানিতে ব্যয় করায় শিক্ষা, চিকিৎসা ও সঞ্চয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
তাই যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাব নয়। এটি মানুষের আয়, রাষ্ট্রের বাজেট এবং আগামী দিনের উন্নয়নকে অনেক দীর্ঘদিন পিছিয়ে দিতে পারে।
এক দেশে যুদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু তার মাশুল দিচ্ছে পুরো বিশ্ব! যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ কমে, জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, বাড়ে পরিবহন খরচ। এর প্রভাব পড়ে খাদ্য, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামে। বিশ্বব্যাংকের ২৮ অক্টোবরের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ না করেও বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান কম, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে যুদ্ধের ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাই যুদ্ধ শুধু মানুষ মারে না, ধ্বংস করে একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
