মো. হারুন-অর-রশিদ: নিত্যদিনের ছোটখাটো কেনাকাটায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ‘ভাঙতি টাকা আছে?’ অথবা ‘ছেঁড়া নোটটি বদলে দিন’। আবার একটু বড় অঙ্কের কেনাকাটায় প্রশ্ন ম্যানিব্যাগে প্রয়োজনীয় নগদ টাকা আছে কি না? এখন সেই প্রশ্নের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করছে ‘ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ আছে তো? ’ ‘বাংলাকিউআর আছে তো?’
একটি মোবাইল ফোন, একটি ব্যাংকিং অ্যাপ এবং বাংলা কিউআর এই তিনটি উপকরণ একটি দোকানের কাউন্টার থেকে নগদ টাকার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ক্রেতা পণ্য কিনছেন, মোবাইল দিয়ে কিউআর স্ক্যান করছেন, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অর্থ পরিশোধ হচ্ছে এবং লেনদেনের একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। কাউন্টারে নগদ গুনতে হচ্ছে না, খুচরা টাকার প্রয়োজন হচ্ছে না, আর বিক্রেতার হাতে থাকা টাকাও আলাদা করে হিসাব করার প্রয়োজন কমছে। বাড়তি আরও কিছু সুবিধা হচ্ছে ছেঁড়া নোট বা জাল নোটের কোন ঝুঁকি নেই।
বাংলাদেশের মতো নগদনির্ভর অর্থনীতিতে এটি শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, এটি লেনদেনের সংস্কৃতির পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের হচ্ছে বাংলা কিউআরকে কেন্দ্র করে। একটি অভিন্ন কিউআর কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার গ্রাহকদের ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কিউআর আর কেবল একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে অপরিহার্য অবকাঠামো হয়ে উঠছে।
বাংলা কিউআরের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হতে পারে দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে। একজন মুদি দোকানি, রেস্তোরাঁ মালিক, ফার্মেসি, পোশাক বিক্রেতা কিংবা ছোট উদ্যোক্তার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের অর্থ শুধু নগদ বিক্রির বিকল্প তৈরি করা নয়। প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেন তার ব্যবসার একটি আর্থিক ফুটপ্রিন্ট তৈরি করে। এই ফুটপ্রিন্ট ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সম্পর্ক, ব্যবসায়িক হিসাব, আর্থিক সেবা এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের নতুন দরজা খুলতে পারে।
বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক
ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১ জুলাই বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রদত্ত কিউআর বাতিল করে ‘এক দেশ, এক কিউআর, লেনদেনে বাংলা কিউআর’ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটির সফল বাস্তবায়নে ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট গ্রাহক এবং সেবাগ্রহীতাদের ইনসেনটিভ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
এনআরবিসি ব্যাংকের উদ্যোগ
পেমেন্ট ব্যবস্থার এই রূপান্তরে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনআরবিসি ব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলা কিউআরকে তার ডিজিটাল ব্যাংকিং উদ্যোগের অংশ করেছে। ব্যাংকের প্লানেট মোবাইল অ্যাপে বাংলা কিউআর অপশন যুক্ত করে সরাসরি পেমেন্ট সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ছোট দোকান থেকে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর প্রদানের মাধ্যমে মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে। উল্লেখ্য, এনআরবিসি ব্যাংক কিউআরে লেনদেন সুবিধা বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই চালু করেছে। ইতোমধ্যে এনআরবিসি মার্চেন্টদের ২১ হাজার বাংলা কিউআর প্রদান করা হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেড় লাখ মার্চেন্টদের বাংলা কিউআর প্রদান করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ হলো ক্যাশলেস অর্থনীতি কেবল বড় শহর বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাস্তার পাশের ছোট দোকান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া।
সক্রিয় ব্যবহারকারী তৈরি করা
সব দোকানে বাংলা কিউআর সরবরাহ করলেই ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরি হবে? এর সহজ উত্তর না। একটি কিউআর কোড দোকানে লাগানো আছে, কিন্তু কেউ ব্যবহার করছে না, তাহলে সেটি ডিজিটাল রূপান্তর নয়। একইভাবে একজন গ্রাহক অ্যাপ ডাউনলোড করলেন, কিন্তু নিয়মিত ডিজিটাল পেমেন্ট করলেন না, তাতেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। এখন অনেক দোকানী আছে যে ডিজিটাল সিস্টেমের প্রতি আস্থাশীল নয়। কিউআর থাকলে নগদ লেনদেন করে থাকে।
তাই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে সক্রিয় ব্যবহার। অর্থাৎ মানুষ কত নিয়মিত নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করছে, মার্চেন্ট কত নিয়মিত কিউআর পেমেন্ট গ্রহণ করছেন এবং লেনদেনের অভিজ্ঞতা কতটা সহজ ও নির্ভরযোগ্য হচ্ছে।
এখানে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব প্রথমত প্রযুক্তিকে সহজ করা। অ্যাপে প্রবেশ করা সহজ হতে হবে, লেনদেন নিশ্চয়তার বার্তাগুলো স্পষ্ট হতে হবে এবং ব্যর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রাহককে শুধু অ্যাপ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিলে হবে না; তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কেও সচেতন করতে হবে। পিন/ওটিপি বা অন্যকোনো ব্যক্তিগত তথ্য কাউকে না দেওয়া, পেমেন্ট করার আগে মার্চেন্ট নাম এবং অর্থের পরিমাণ যাচাই করা এবং সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।
মার্চেন্টের করণীয়
বাংলা কিউআরের প্রয়োজনীয়তা মার্চেন্টদের বুঝতে হবে। নগদ লেনদেনের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর জন্য এবং স্বচ্ছ ও নিরাপদ হিসাব রক্ষার সুবিধার্থে এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাই গ্রাহকদের কিউআর লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি তাদের করতে হবে। কিউআর কোডটি এমন স্থানে রাখতে হবে যেখানে গ্রাহক সহজে দেখতে ও স্ক্যান করতে পারেন। পেমেন্ট গ্রহণের পর শুধু গ্রাহকের মোবাইলের স্ক্রিন দেখে নিশ্চিত না হয়ে নিজের মার্চেন্ট অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে লেনদেন যাচাই করা উচিত।
একইসঙ্গে ব্যবসার দৈনিক লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণ করা দরকার। ডিজিটাল পেমেন্টের অন্যতম বড় সুবিধাই হলো লেনদেনের ইতিহাস। এই তথ্য ব্যবসার নগদ লেনদেন ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
গ্রাহকের করণীয়
গ্রাহকের জন্য বিষয়টি আরও সহজ। কেনাকাটার সময় সম্ভব হলে নগদের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহার করা, পেমেন্টের আগে মার্চেন্টের নাম ও পরিমাণ যাচাই করা এবং লেনদেন সফল হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া। এগুলো অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ। তবে প্রবীণ, কম ডিজিটাল দক্ষতা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংকিং খাতের সামনে নতুন দায়িত্ব
বাংলা কিউআরের বিস্তার ব্যাংকগুলোর জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি অ্যাকাউন্ট তৈরি করল কে বেশি কার্ড প্রদান করল এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হবে কে গ্রাহকের দৈনন্দিন পেমেন্ট অভ্যাসের সঙ্গে সবচেয়ে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে।
বাংলা কিউআর এমন এক পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে যা এখন পরিমাপযোগ্য একটি আর্থিক অবকাঠামোতে পরিণত হচ্ছে। এই তথ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে বিবেচ্য। তবে এই রপান্তর প্রক্রিয়ায় সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ, গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে প্রযুক্তির বিস্তারও টেকসই হবে না।
ক্যাশলেস বাংলাদেশ মানে এমন একটি দেশ নয়, যেখানে আগামীকাল থেকেই সব নগদ টাকা অদৃশ্য হয়ে যাবে। বরং এর অর্থ হলো, যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিরাপদ, সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল পেমেন্ট মানুষের স্বাভাবিক পছন্দে পরিণত হবে। বাংলা কিউআর সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিচ্ছে, ব্যাংকগুলো মার্চেন্ট ও গ্রাহককে যুক্ত করছে এবং প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। এখন প্রয়োজন তিন পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ববোধ। ব্যাংককে দিতে হবে নির্ভরযোগ্য সেবা, মার্চেন্টকে গ্রহণ করতে হবে ডিজিটাল লেনদেনের সংস্কৃতি এবং গ্রাহককে হতে হবে সচেতন ব্যবহারকারী। একটি কিউআর কোড দেখতে ছোট। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা, নগদনির্ভর লেনদেন থেকে তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশের যাত্রা।
লেখক : হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড রিলেশন ডিপার্টমেন্ট (পিএআরডি), এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি