প্রযুক্তি ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারে কাস্টমার সার্ভিস বা গ্রাহকসেবায় এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কল সেন্টারের বিভিন্ন সাধারণ কাজ, তথ্য সংগ্রহ কিংবা সাধারণ কল আদান-প্রদানের মতো প্রাথমিক বিষয়গুলো এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সময় ও ব্যয় কমছে, অন্যদিকে মানব কর্মীদের কাজের ধরন হয়ে উঠছে অনেক বেশি জটিল এবং তাদের ওপর মানসিক চাপ ও ‘বার্নআউট’-এর ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, গ্রাহকসেবায় এআই ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল মেকানিকাল বা খাতা-কলমের দাপ্তরিক কাজগুলো প্রযুক্তির হাতে সোপর্দ করা, যাতে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মানুষের সহানুভূতি, অভিজ্ঞতা ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন এমন জটিল বিষয়গুলোতে বাড়তি মনোযোগ দিতে পারেন। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক, টেলিকম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকসেবার বড় অংশ এআই প্রসেসিংয়ের আওতায় নিয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠান ‘আরভাতো কানেক্ট’-এর প্রধান নির্বাহী দেবরা ম্যাক্সওয়েল জানান, তারা তাদের মোট যোগাযোগের ৭০ শতাংশ প্রযুক্তির মাধ্যমে এবং বাকি ৩০ শতাংশ সরাসরি মানুষের মাধ্যমে পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেছেন। একইভাবে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় টেলিকম প্রতিষ্ঠান ভার্জিন মিডিয়া ওটু সম্প্রতি বিশেষ এআই ভয়েস এজেন্ট চালু করেছে, যা সাধারণ তথ্য প্রদান করে কর্মীদের জটিল কেস সামলানোর সুযোগ করে দেয়।
তবে আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিকে সুবিধাজনক মনে হলেও বাস্তবে এর ভিন্ন রূপ দেখছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। সিএনবিসির সঙ্গে আলাপকালে এ সেক্টরের একাধিক কর্মী জানান, এআই থেকে তৈরি হওয়া নোট বা তথ্যে প্রায়ই ভুল থেকে যায়। এর ফলে ভুল সংশোধন করতে গিয়ে কর্মীদের উল্টো বাড়তি সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে। এছাড়া অনেক সময় কোনো বিষয়ে এআই সঠিক সমাধান দিতে ব্যর্থ হলে গ্রাহক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময় সেই ক্ষুব্ধ গ্রাহকের সঙ্গে যখন মানব কর্মীর কথা হয়, তখন ওই ঝামেলার পুরো চাপ এসে পড়ে কর্মীর ওপর। এতে করে প্রতিনিয়ত কেবল জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে কর্মীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
যুক্তরাজ্যের ‘ম্যাক্সকন্টাক্ট’-এর ২০২৫-২৬ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটির অর্ধেকেরও বেশি কল সেন্টার পরিচালক স্বীকার করেছেন যে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মীদের ওপর কাজের চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিষয়ক গবেষক ও কিংস কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞ আমান্ডা জোন্স জানান, কাজের মাঝে সাধারণ কিছু সহজ কাজ থাকলে তা কঠিন কাজের ভিড়ে কর্মীদের কিছুটা মানসিক স্বস্তি দেয়। কিন্তু এআই আসার ফলে সহজ কাজগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং পুরো কর্মদিবসে কর্মীদের কেবল সবচেয়ে জটিল ও মানসিক চাপযুক্ত সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর ওপর প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট কর্মীদের প্রাত্যহিক মানসিক প্রেসার আরও বাড়াচ্ছ।
প্রযুক্তি কাজের গতি বাড়ালেও কোনো মানুষের আন্তরিকতা, অভিজ্ঞতা ও সহমর্মিতার বিকল্প হতে পারে না। দ্রুত কাজ শেষ করার প্রতিযোগিতায় গ্রাহক সেবার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। ফলে শুধু কম সময়ে কাজ শেষ করা নয়, বরং কর্মী গ্রাহকের সমস্যা বুঝতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন কি না সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে পারফরম্যান্স মূল্যায়নের নতুন মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।