জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: অনেক বছর ধরে আমরা একটা কথা শুনে আসছি, এই তো মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে টিভি, ফ্রিজ কিংবা জুতা—সবকিছুর গায়ে লেখা থাকে তৈরি করার বিশেষ দেশের নাম। কিন্তু খুব শিগগিরই এমন একটা সময় আসতে পারে যখন চীনা কোম্পানির তৈরি পণ্যের গায়ে লেখা থাকবে আমাদের দেশের নাম। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশেই তৈরি হবে সেইসব পণ্য যেগুলো এতদিন সরাসরি বাইরে থেকে আসত। শুনতে অবাক লাগলেও এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রায় এক দশক ধরে আটকে থাকা একটি বিশেষ প্রকল্প। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তৈরি হতে যাওয়া চাইনিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সরকার বলছে এখানে আসতে পারে অন্তত পাঁচশ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ, আর তৈরি হতে পারে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান।
চলুন জানার চেষ্টা করি এই প্রকল্প আসলে কী? কেন চীন আমাদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল বানাচ্ছে? চীনা কোম্পানিগুলো কি সত্যিই কারখানা সরিয়ে আনছে? চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর পূর্বপাশে এবং কর্ণফুলী টানেলের খুব কাছেই এই এলাকাটি গড়ে উঠছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর কাছে থাকায় এই অবস্থানটিকে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি বলা হচ্ছে। কারণ পণ্য তৈরি হয়ে সরাসরি জাহাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যাবে। ফলে খরচ ও সময় দুটোই কমবে।
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটির আয়তন প্রায় আটশ একর। এটি শুধু জমি নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরী। পরিকল্পনায় রয়েছে নিজস্ব জেটি, সংযোগ সড়ক, চার লেনের রাস্তা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য শোধনাগার। অর্থাৎ যেকোনো বিদেশি কোম্পানি চাইলে এখানে এসে সহজে কারখানা তৈরি করতে পারবে।
কিন্তু এত বছর ধরে কেন এই প্রকল্প আটকে ছিল? আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং নানামুখী প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি পিছিয়ে যায়। তবে অবশেষে এর অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। যেখানে খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার একশ উনআশি কোটি টাকা। যার একটি বড় অংশ আসবে ঋণ থেকে।
প্রশ্ন হলো, চীন কেন আমাদের দেশে কারখানা আনতে চাইছে? কারণ এখন সেখানে শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে। তাই তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র ছড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যবসায়িক ভাষায় একে বলা হয় চীন প্লাস ওয়ান নীতি। অর্থাৎ মূল কারখানা এক জায়গায় রেখে অন্য দেশেও শাখা গড়া। আমাদের দেশের সস্তা শ্রমবাজার, বড় তৈরি পোশাক শিল্প এবং উন্নত বন্দর সুবিধার কারণে চীনা কোম্পানিগুলো এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে তিরিশটির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান এখানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের হাত ধরে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি এই পরিকল্পনা সফল হয়, তবে আগামী দিনে বিশ্বের বহু পণ্যের গায়ে আর বাইরের দেশের নাম দেখা যাবে না, বরং লেখা থাকবে আমাদের দেশের নাম।
ঘরের কাছেই তৈরি হবে বিদেশি ব্র্যান্ডের সব জিনিস
খুব শিগগিরই হয়তো আপনার হাতের মোবাইল ফোন বা জুতার গায়ে আর বাইরের দেশের নাম দেখতে পাবেন না। কারণ এবার আমাদের দেশেই তৈরি হতে যাচ্ছে নামী দামী সব চীনা পণ্য। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশাল এলাক জুড়ে গড়ে উঠছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। যেখানে খরচ কমবে আর তৈরি হবে লাখ লাখ নতুন চাকরি। সব জিনিস এবার আমাদের দেশেই তৈরি হলে আমাদের অর্থনীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে একবার ভেবে দেখুন।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি