হারুনুর রশিদ, ঢাকা: মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম, কম্পিউটার ল্যাব ও ইন্টারনেট সংযোগের ঘাটতিতে ডিজিটাল শিক্ষায় পিছিয়ে আছে দেশের নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং সরঞ্জাম ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতাও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫’ অনুযায়ী, সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর থাকলেও নিম্নমাধ্যমিকে এ সুবিধা আছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানে। প্রায় অর্ধেক নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নেই ইন্টারনেট সংযোগ। অন্যদিকে দাখিল থেকে কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসাগুলোর সাড়ে ৮৭ শতাংশেই ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব নেই।
প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান সম্প্রসারণে প্রায় ২১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাদ্রাসার জন্যও পৃথক উদ্যোগের প্রাথমিক পরিকল্পনা চলছে। তবে এসব প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুবিধা পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে।
এক কম্পিউটার, সেটিও দাপ্তরিক কাজে
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর মহিলা দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরুলেও সেখানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ নেই। পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ডেস্কটপ কম্পিউটার আছে একটিমাত্র। সেটিও ব্যবহার হয় কেবল দাপ্তরিক কাজে। এই মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম চেয়ে একাধিকবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’ তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি ভবনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানেও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় প্রযুক্তিগত সুবিধার ঘাটতি স্পষ্ট। দেশের ১৬ হাজার ৭৩৭টি সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২ হাজার ৪৫১টিতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর রয়েছে। এ সুবিধা থাকা প্রতিষ্ঠানের হার ৭৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বিপরীতে ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৬১২টিতে এ সুবিধা আছে। বাকি ১ হাজার ৮৬২টি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর নেই।
ইন্টারনেট সংযোগেও রয়েছে বড় ব্যবধান। সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও নিম্নমাধ্যমিকে এ হার ৫২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশে এখনও ইন্টারনেট সংযোগ নেই।
মাদ্রাসায় ল্যাবের সুযোগ সীমিত
দেশে দাখিল থেকে কামিল পর্যায় পর্যন্ত ৯ হাজার ২৯৬টি মাদ্রাসা রয়েছে। ব্যানবেইসের হিসাবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব আছে ১ হাজার ১৬৫টিতে। এ সুবিধা থাকা প্রতিষ্ঠানের হার মাত্র ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। পরিসংখ্যানে পৃথকভাবে উল্লেখ করা ‘বিশেষায়িত কম্পিউটার ল্যাব’ রয়েছে ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ মাদ্রাসায়।
এসব মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। তবে মোট শিক্ষকের মধ্যে আইসিটি শিক্ষকের এই অনুপাত থেকে কতটি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই তা নির্ধারণ করা যায় না।
মাদ্রাসায় প্রযুক্তি সম্প্রসারণের বিষয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ও উপসচিব মো. আবুল কালাম তালুকদার জাতীয় অর্থনীতিকে জানান, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের ট্যাবলেট সরবরাহের উদ্যোগ নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা চলছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ব্যয় ও অর্থায়নের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি জানান, মাদ্রাসার সক্ষমতা উন্নয়ন ও আইসিটি ল্যাব স্থাপনসংক্রান্ত আরও কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এমপিওভুক্ত ৮ হাজার ২২৯টি মাদ্রাসাকে আওতায় আনার সম্ভাবনা আছে। তবে বাস্তবায়নে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
ঘাটতি মাধ্যমিকেও
মাধ্যমিক পর্যায়েও বিজ্ঞান ও কম্পিউটার শিক্ষার অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে এ পর্যায়ের ৬৩ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানাগার ছিল। অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ২০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে এ সুবিধা নেই। কম্পিউটার ল্যাব ছিল ৪১ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। বাকি ৫৮ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব নেই। তবে ল্যাবের উপস্থিতি ও পাঠদানে কম্পিউটারের ব্যবহার এক বিষয় নয়।
একই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬২ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে কম্পিউটার এবং ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট ব্যবহার করা হতো। এসব তথ্য থেকে ব্যবহারের উপস্থিতি জানা গেলেও তা কতটা নিয়মিত ও কার্যকর সেটি জানতে আলাদা মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। মাধ্যমিক পর্যায়ের ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এবং ৯৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল হাজিরার ব্যবস্থা ছিল না।
বড় ব্যয়ের দুই প্রকল্পের পরিকল্পনা
মাউশির তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান বাড়াতে পরিকল্পিত দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটির সম্ভাব্য ব্যয় ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর আওতায় ১০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানপ্রতি ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড সংযোগ, শিক্ষকদের ট্যাবলেট সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ এবং অনলাইন শিক্ষামঞ্চ ও ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর। তবে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ প্রস্তুতিমূলক কাজ এখনও চলছে। কোন প্রতিষ্ঠান কবে সুবিধা পাবে তা নির্ভর করছে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপর।
অন্যদিকে ‘নেক্সট জেনারেশন এডুকেশন প্রোগ্রাম’ বা এনজিইপি নামে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে। এর আওতায় উপজেলা পর্যায়ের ১ হাজার স্কুলে ৩ হাজার শ্রেণিকক্ষ এবং ১ হাজার ৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ১০০টি আইসিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার গবেষণা কর্মকর্তা শেফাতুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, প্রযুক্তির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি এবং নিজেদের প্রকল্প হাতে-কলমে তৈরিতে সহায়তা দেওয়াই এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য। প্রচলিত পদ্ধতির পাঠদান অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধাও পরিবর্তিত দক্ষতার চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
সরঞ্জামের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম সরবরাহ ও কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। তবে সরঞ্জাম অব্যবহৃত বা অচল হয়ে থাকা, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যানবেইসের এক গবেষণায় ৩৮৪টি স্কুল ও মাদ্রাসার ১ হাজার ৬৫৫টি আইসিটি সরঞ্জামের মধ্যে ২১৫টি অব্যবহৃত এবং ২৪৮টি নষ্ট পাওয়া যায়। এ অভিজ্ঞতা থেকে সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলো সচল রাখা ও নিয়মিত পাঠদানে ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজন সামনে আসে।
শিক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে ইউনেসকোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং প্রতিবেদনেও শিক্ষক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও উপযুক্ত পরিচালন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ হলো— প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজন বিবেচনায়। প্রযুক্তি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগে সহায়তা করবে সেই যোগাযোগের বিকল্প হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, শিক্ষার বিভিন্ন স্তরকে সমন্বিত করে পরিকল্পনা নেওয়ার পরিবর্তে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেখানে শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে সেখানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম সরবরাহের আগে মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান জরুরি।
তার মতে, কত শতাংশ শিক্ষক মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন এবং কতটা কার্যকরভাবে করছেন তা নিয়ে গভীর গবেষণা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। অনেক শিক্ষক সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি না জানায় পুরো ক্লাসে শুধু পর্দায় স্লাইড দেখান। অথচ প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি, চার্ট, গ্রাফ বা ভিডিও দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া সহজ করাই মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারের উদ্দেশ্য।
নতুন প্রকল্পে সামগ্রিক পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যেখানে বাস্তব উপকরণ দিয়ে শেখানো সম্ভব সেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কৃত্রিম উপকরণের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তার ভাষায়, ‘বিষয়টা অনেকটা রোদে না গিয়ে ছায়ায় বসে ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার মতো হয়ে গেছে!’