বিদেশি ঋণ পরিশোধ দ্বিগুণেরও  বেশি, সহায়তা নেমেছে অর্ধেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বৈদেশিক ঋণের চাপ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এ সময়ে পাওয়া বৈদেশিক সহায়তার দ্বিগুণেরও বেশি অর্থঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক সহায়তার ঋণ ছাড়ও প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। 

গতকাল সোমবার বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। প্রতিবেদনে বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ার উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

ইআরডি বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগের (২০২৫-২৬) অর্থবছরের এ সময়ে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তার ছাড় ৪২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। ফলে এ সময়ে বৈদেশিক সম্পদের নিট প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে ঋণাত্মক হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে তিন মাসে বৈদেশিক সহায়তা এসেছিল ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার।  

ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি ১ ডলার বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার বিপরীতে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ২ দশমিক ০৪ ডলার ব্যয় করেছে বাংলাদেশ। বৈদেশিক সম্পদের প্রবাহে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বিপরীত চিত্র।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট ঋণ পরিশোধের মধ্যে আসল বাবদ দেওয়া হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৮১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। একই সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণও বেড়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের ৪৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের তুলনায় এবার সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ডলার।

বৈদেশিক সহায়তার ছাড় নেমেছে অর্ধেকে
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় এমন সময়ে বেড়েছে, যখন বিদেশি সহায়তার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন সহযোগীরা ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার বৈদেশিক সহায়তা ছাড় করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ১১৪ কোটি ৯ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তার ছাড় কমেছে প্রায় ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ বা ৪৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার। চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে ছাড় করা মোট বৈদেশিক সহায়তার মধ্যে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার এসেছে ঋণ হিসেবে এবং ১১ কোটি ৫ লাখ ডলার অনুদান হিসেবে।

সেই হিসেবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে যত অর্থ পেয়েছে, তার দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় করেছে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে।

নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৪০ শতাংশ 
বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে দ্বিগুণ ব্যয় হলেও নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার ঋণ ও অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগের (২০২৫-২৬) অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। নতুন প্রতিশ্রুতির মধ্যে ১১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার ঋণ এবং ১২ কোটি ৫৪ লাখ ডলার অনুদান হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে।

তবে ইআরডির তথ্য বলছে, তিন মাসে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো উন্নয়ন– সহযোগীরা কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। বড় উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে শুধু জাপান ৩৫ লাখ ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

অবশ্য বড় উন্নয়ন-সহযোগীরা তাদের আগের প্রতিশ্রুত ঋণ ছাড় করেছে। চলতি অর্থবছরে বিদেশি ঋণ ছাড়ে এগিয়ে আছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। অর্থবছরের তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক, ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। এরপরেই আছে এডিবি, ১৬ কোটি ২১ লাখ ডলার দিয়েছে। তৃতীয় স্থানে থাকা ভারত দিয়েছে সাড়ে ১০ কোটি ডলার। রাশিয়া দিয়েছে ২ কোটি ডলার ও চীন দেড় কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি বাড়লেও প্রকৃত অর্থ ছাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের তাৎক্ষণিক বৈদেশিক অর্থায়ন পরিস্থিতি চাপে ছিল।