ছাত্রদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দুর্বল হয়ে পড়া সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে নামছেন শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’আন্দোলনের কর্মীরা। গত মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র শহরতলির কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিক্ষোভের সূচনা। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি এবং বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দ্রুত দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। বৈষম্য, সরকারি খাতে অপর্যাপ্ত ব্যয় এবং শিক্ষার মান ক্রমে নিম্নমুখী হওয়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের জন্য এমন এক কঠিন সময়ে এই বিক্ষোভ হচ্ছে, যখন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখো তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। তার মেয়াদে ভোটারদের মধ্যে গভীর বিভাজন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে খণ্ডিত অবস্থা স্পষ্ট। এদিকে বিনিয়োগকারীরা ফ্রান্সের সরকারি ঋণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় ঋণ গ্রহণের ব্যয় গত দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার দীর্ঘদিনের সংগ্রামকেও এটি নতুন করে সামনে এনেছে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, বিক্ষোভ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। সরকার বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য কট্টর বামপন্থি রাজনৈতিক দল ফ্রান্স আনবোডকে (এলএফআই) দায়ী করেছে। দলটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

লেকর্নু বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। আমরা যেন একের পর এক সংকটের স্থায়ী আবহে বসবাস করছি। যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে।’ প্যারিস মোটর শো পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’

সহিংস বিক্ষোভ: লেকর্নু বলেছেন, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস বিক্ষোভগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। আন্দোলন শুরুর পর থেকে নয়শ’র বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। আহতদের তালিকায় রয়েছে গুরুতর আঘাতের ঘটনা। এর মধ্যে এক কিশোর স্টান গ্রেনেড কুড়িয়ে নেওয়ার পর সেটি বিস্ফোরিত হলে তার একটি হাত উড়ে যায়।

পুলিশের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম তদারককারী সংস্থা পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে অন্তত দুই ডজন ঘটনার তদন্ত করছে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করেছিল ফ্রান্স। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে এসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হতে পারে।

গত শুক্রবার টেলিভিশন অনুষ্ঠান তেলেমাতাঁকে তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিভিন্ন ধরনের অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের সদস্যদের নতুন করে বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই আহ্বান সাড়া ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। ফলে এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত বড় আকার ধারণ করতে পারে।

২০১৮ সালে ডিজেলের ওপর কর আরোপের প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়বৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয় আন্দোলনটি। তবে ম্যাখো কয়েকশ’ কোটি ইউরো করছাড় দিতে সম্মত হওয়ার পর আন্দোলনটি স্তিমিত হয়ে পড়ে।

ফ্রান্সের লা ক্রেশ শহরের শিক্ষক ইয়ানিক মাইয়ু ২০১৮ সালে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এখনও তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তার ভাষ্য, বিক্ষোভে অংশ নিতে আন্দোলনকারীদের জড়ো হওয়ার জন্য আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি নির্ধারিত স্থান রয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও তাদের সদস্যদের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের সহিংসতার আশঙ্কায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দল গঠন করা হচ্ছে।’

ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মী মির্তিল দেভিলিয়ে বিক্ষোভকারীদের নানা অভিযোগের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তবে বিদেশে অবস্থান করায় তিনি বিক্ষোভে অংশ নিতে পারবেন না।‌ তিনি বলেন, ‘যখন প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১ দশমিক ৪০ ইউরো ছিল, তখন আমি ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। এখন দাম বেড়ে ২ দশমিক ২০ ইউরো হওয়ায় আমার অনুভূতি কেমন, তা একবার ভেবে দেখুন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা অভিযোগ করছে, শিক্ষাব্যবস্থা অভিযোগ করছে, স্বাস্থ্যসেবা খাত অভিযোগ করছে। এমনকি আমার যেসব বন্ধু ব্যবসা পরিচালনা করেন, তারাও অভিযোগ করছেন।’