সালমান শাহর শেষ রাতে কী ঘটেছিল?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

মাত্র ২৫ বছর বয়স। যে বয়সে স্বপ্ন শুরু হয়, ঠিক সেই বয়সে আকাশচুম্বী খ্যাতির শিখরে দাঁড়িয়ে থেমে গিয়েছিল একটি হৃদস্পন্দন। বাংলা সিনেমার স্টাইল আইকন, কোটি তরুণের ধুকপুকানি-সালমান শাহ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার নিথর দেহ যখন ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মেলে, পুরো দেশ থমকে গিয়েছিল। তারপর কেটে গেছে তিন দশক। তদন্ত সংস্থাগুলো বলেছে ‘আত্মহত্যা, কিন্তু পরিবারের আর্তনাদ ছিল একটাই-‘হত্যা’।

তিন দশক পর সেই রহস্যের ফাইল আবার খুলেছে। কবর থেকে দেহ উত্তোলনের নির্দেশ, নতুন হত্যা মামলা এবং একের পর এক নাটকীয় গ্রেপ্তার। আজ ২০২৬-এ এসে পুরো বাংলাদেশ আবার সেই একই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে-সেদিন আসলে কী ঘটেছিল?

সালমান শাহ শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক উল্কা। মাত্র সাড়ে তিন বছরে ২৭টি সিনেমা, যার প্রায় সবই সুপারহিট।

চলচ্চিত্রে আসার আগেই, ১৯৯২ সালের ২০ ডিসেম্বর ভালোবেসে তিনি বিয়ে করেছিলেন সামিরা হককে। সামিরা শুধু জীবনসঙ্গী ছিলেন না, সালমানের লুক ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনার বড় অংশীদারও ছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের পারদ যত দ্রুত চড়েছিল, পর্দার বাইরের আলো-ছায়ার খেলায় ব্যক্তিগত জীবনও ততটাই জটিল হয়ে উঠছিল। খ্যাতি, অর্থ, মানুষের প্রত্যাশা-আর তার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল দুই তরুণ-তরুণীর বোঝাপড়া।

সালমানের ক্যারিয়ারে বহু নায়িকা এসেছেন, কিন্তু শাবনূরের সঙ্গে তার রসায়ন ছিল রূপকথার মতো। দর্শক এই জুটিকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু পর্দার এই জাদুকরী রসায়ন একসময় ছড়িয়ে পড়ে বাস্তব জীবনের গুজবেও।

গুঞ্জন রটে-তাদের সম্পর্ক শুধুই কি পর্দার ভেতরেই সীমাবদ্ধ? সামিরা পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, সালমান নাকি তার কাছে এই টানাপোড়েনের কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে শাবনূর বরাবরের মতোই এই গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন ও অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রির অপব্যাখ্যা বলে উড়িয়ে দেন।

আজ এত বছর পর একটা বিষয় বোঝা খুব জরুরি-ব্যক্তিগত ক্ষোভ, পত্রিকার জল্পনা আর আইনি প্রমাণ-তিনটি কিন্তু এক নয়। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ত্রিমুখী গুঞ্জন সালমানের ব্যক্তিগত জীবনকে এক চরম মানসিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬। ইস্কাটনের ফ্ল্যাটের ভেতর সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এই মেগাস্টারকে। সেই যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তা আজও মিটেনি। প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হলেও সালমানের মা নীলা চৌধুরী ও পরিবার সরাসরি অভিযোগ তোলে-সালমানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্তের গোলকধাঁধা। ১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত করে রায় দেয়-এটি আত্মহত্যা। পরিবার তা মানেনি। দুই দশক পর, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই-ও দীর্ঘ তদন্ত শেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তেই পৌঁছায় এবং ২০২১ সালে আদালত তা গ্রহণ করে। সরকারি নথিতে ঘটনাটি বারবার ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু ভক্ত আর পরিবারের অটল বিশ্বাসের কারণে ফাইলটি কোনোদিনই পুরোপুরি চাপা পড়েনি।

তারপর আসে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড়। আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালে সালমান শাহর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে হত্যা মামলা রুজু হয়। আসামি তালিকায় সামিরা হক এবং সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহ-অভিনেতা ডনসহ মোট ১১ জন।

আইনের চোখে আসামি হওয়া মানেই অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া নয়, তবে ঘটনা সেখানেই থামেনি। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালত দেয় এক যুগান্তকারী নির্দেশ-মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে সালমানের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনঃময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়।

আর সর্বশেষ বড় বিস্ফোরণ ঘটে আগস্ট ২০২৬-এ। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন অভিনেতা ডন, আদালত নাকচ করে দেন তার জামিনের আবেদন। আদালত তদন্ত সংস্থাকে কড়া নির্দেশ দেয় ৩০ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করতে। তিন দশক ধরে ধামাচাপা পড়া সব প্রশ্নের উত্তর যেন এবার হঠাৎ করেই সময়ের মুখোমুখি।

আজ ত্রিশ বছর পরও দেশের অলিগলিতে তার স্টাইল বেঁচে আছে, টিভির পর্দায় আজও তার ডায়লগ শুনলে চোখ ভিজে ওঠে কোটি ভক্তের। সালমান শাহ বেঁচে আছেন তার অমর সৃষ্টির মাঝে।

কিন্তু চলচ্চিত্রের পর্দায় সালমান যতবারই অন্যায়ের বিচার করেছেন, বাস্তব জীবনের চিত্রনাট্যে তার নিজের মৃত্যুর বিচারটা আজও অমীমাংসিত থেকে গেছে। আত্মহত্যা, নাকি এক নির্মম হত্যাকাণ্ড? আধুনিক ফরেনসিক আর আদালতের এই নতুন তদন্ত কি পারবে তিন দশকের জমে থাকা কুয়াশা দূর করতে? উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে আদালতের সেই আগামী সিদ্ধান্তের পাতায়।

একটি দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্যের শেষ দৃশ্য দেখতে আজ পুরো দেশ তাকিয়ে আছে। সত্য এবার প্রকাশ্যে আসুক-সালমানের আত্মার শান্তি হোক।

সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি হত্যা করা হয়েছিল?

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। শুরু থেকেই তার মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয় রহস্য। সিআইডি তদন্ত বলেছিল-আত্মহত্যা। পিবিআই-ও পরে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কিন্তু সালমানের পরিবার বরাবরই দাবি করেছে-তাকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রায় ৩০ বছর পর ২০২৫ সালে আদালতের নির্দেশে আবারও হত্যা মামলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় ১১ জনকে। ২০২৬ সালে আদালত নতুন করে মরদেহ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতিও দেয়। এরপর আগস্টে মামলার এক আসামি, অভিনেতা ডন, গ্রেপ্তার হন।

আর এখন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নতুন তারিখ-৩০ আগস্ট ২০২৬। তাহলে এবার কি জানা যাবে-সালমান শাহর মৃত্যুর আসল রহস্য?

সালমান শাহর সংসারে কি শাবনূরই ছিলেন ঝড়ের কারণ?

সালমান শাহ ও সামিরা-ভালোবাসার সম্পর্ক থেকে বিয়ে। ১৯৯২ সালে শুরু হয় তাদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু সালমান যখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক হয়ে উঠলেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনও চলে আসে আলোচনায়। বিশেষ করে নায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। পর্দায় দুজনের জনপ্রিয় জুটি থেকেই তৈরি হয়েছিল এই আলোচনা।

সামিরা পরবর্তীতে দাবি করেন, সালমান তার কাছে শাবনূরের সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে এই সম্পর্কের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য এক নয়।

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এই সম্পর্কের টানাপোড়েন কি সালমানের জীবনের শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল? এখনও এর নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে ৩০ বছর পর সালমান শাহর মৃত্যুর নতুন তদন্ত শুরু হওয়ায় পুরনো সব প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। আর অপেক্ষা-সত্যটা জানার।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি