মানুষের অর্থনীতির মঙ্গল গ্রহ ভার্সন কেমন হবে?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

মঙ্গলে যদি সত্যিই মানুষের বসতি গড়ে ওঠে, সেখানে টাকা দিয়ে কী কেনা হবে? পৃথিবীর মতো চাকরি, ব্যবসা, ব্যাংক আর সম্পত্তির বাজার কি তৈরি হবে? নাকি মঙ্গলে টাকার চেয়েও মূল্যবান হবে পানি, অক্সিজেন আর বিদ্যুৎ? মানুষের স্থায়ী বসতি হলে মঙ্গলের অর্থনীতি কীভাবে কাজ করতে পারে, সেটিই আজকের প্রশ্ন।

মঙ্গল গ্রহে মানুষের স্থায়ী বসতি এখনো বাস্তব হয়নি। তবে মানুষ যদি সেখানে সত্যিই শহর গড়ে তোলে, তাহলে পৃথিবীর প্রচলিত অর্থনীতিকে হুবহু মঙ্গলে নেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ সেখানে অর্থনীতির প্রথম শর্তই হবে বেঁচে থাকা।

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল মানুষের শ্বাস নেওয়ার উপযোগী নয়। সেখানে তরল পানি সহজে পাওয়া যায় না, তাপমাত্রাও অত্যন্ত কঠিন। ফলে পানি, অক্সিজেন, খাদ্য ও বিদ্যুৎ হয়ে উঠবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

পৃথিবীতে এক লিটার পানি হয়তো খুব সাধারণ একটি পণ্য। কিন্তু মঙ্গলে সেই পানিই পান করা, কৃষিকাজ, অক্সিজেন উৎপাদন এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাই মঙ্গলের অর্থনীতিতে পানির মূল্য হবে একেবারেই ভিন্ন।

এই কারণেই নাসা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ধারণাটি হলো, পৃথিবী থেকে সবকিছু নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মঙ্গল থেকেই প্রয়োজনীয় কিছু সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহার করা।

এর একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া গেছে নাসার ‘মক্সি’ পরীক্ষায়। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদান কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরি করার প্রযুক্তি সেখানে পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মক্সি মোট ১২২ গ্রাম অক্সিজেন তৈরি করে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের মঙ্গলে যে প্রতিষ্ঠান পানি, অক্সিজেন, শক্তি বা নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করতে পারবে, তাদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব হবে বিশাল।

তাহলে চাকরি কেমন হবে?

প্রথম দিকে মঙ্গলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশাগুলো সম্ভবত হবে প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃষি, রোবোটিক্স, সফটওয়্যার, নির্মাণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। একজন যন্ত্র প্রকৌশলী সেখানে শুধু মেশিন বানাবেন না, হয়তো সেই মেশিন সচল রাখাই পুরো বসতির নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

কিন্তু টাকা আসবে কোথা থেকে?

প্রথম পর্যায়ে মঙ্গলের অর্থনীতি সম্ভবত পৃথিবীর মতো পুরোপুরি বাজারনির্ভর হবে না। পানি, অক্সিজেন, বিদ্যুৎ, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক বিষয়গুলো হয়তো সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। এরপর বসতি বড় হলে পণ্য, সেবা, মজুরি ও ব্যবসার বাজার তৈরি হতে পারে।

মঙ্গলের মুদ্রা কী হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। স্থানীয় ডিজিটাল মুদ্রা, পৃথিবীর কোনো মুদ্রা কিংবা সম্পূর্ণ নতুন কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সবই সম্ভাবনা।

আর বাণিজ্য?

শুরুতে মঙ্গল পৃথিবী থেকে যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস ও বিশেষায়িত পণ্য আমদানি করবে। কিন্তু পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় ধীরে ধীরে স্থানীয় উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মঙ্গলের মাটি ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে নির্মাণসামগ্রী, পানি, অক্সিজেন কিংবা জ্বালানি তৈরি করা গেলে পৃথিবীর ওপর নির্ভরতা কমবে।

সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হতে পারে সম্পত্তি। মঙ্গলের জমির মালিক কে হবে? কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি কি সেখানে জমির মালিক হতে পারবে? নাকি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মঙ্গলের ভূমি ব্যক্তিগত মালিকানার বাইরে থাকবে?

বর্তমান আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন মহাকাশে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌম মালিকানা দাবি করার সুযোগ সীমিত করেছে। ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত কোম্পানি ও মানুষের বসতি বাড়লে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নতুন আইন প্রয়োজন হতে পারে।

তাই মঙ্গলের অর্থনীতি শুরু হবে সম্ভবত টাকার হিসাব দিয়ে নয়, সম্পদের হিসাব দিয়ে।

পৃথিবীতে প্রশ্ন হয় আপনার ব্যাংকে কত টাকা আছে? মঙ্গলে হয়তো প্রশ্নটা হবে আপনি কত পানি, কত শক্তি আর কত অক্সিজেন তৈরি করতে পারেন?

টাকার চেয়েও মূল্যবান হবে পানি?

মঙ্গলে মানুষের বসতি হলে সবচেয়ে দামি সম্পদ হয়তো সোনা বা টাকা হবে না, হবে পানি, অক্সিজেন আর বিদ্যুৎ। কারণ এগুলো ছাড়া সেখানে বেঁচে থাকাই কঠিন। নাসার মক্সি পরীক্ষায় মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে অক্সিজেন তৈরির প্রযুক্তিও সফলভাবে পরীক্ষা হয়েছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে পানি, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী তৈরি করা গেলে পৃথিবী থেকে সবকিছু নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। তখন মঙ্গলের অর্থনীতির মূল শক্তি হবে স্থানীয় উৎপাদন।

মঙ্গলে চাকরি কেমন হবে?

প্রথম দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশা হতে পারে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ ও নির্মাণকর্মীর। কারণ সেখানে একটি যন্ত্র নষ্ট হওয়া মানেই বড় বিপদ। একইভাবে খাবার, পানি ও অক্সিজেন উৎপাদন হবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। আর জমির মালিকানা হবে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। অর্থাৎ মঙ্গলে অর্থনীতি পৃথিবীর মতো শুরু নাও হতে পারে। সেখানে প্রথম বাজার তৈরি হবে বেঁচে থাকার প্রয়োজন থেকেই।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি