সুমন মিয়া, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ): নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রয়াত বামপন্থি নেতা জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়ি।
সোনারগাঁয়ের বারদী ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক এ বাড়িতে জ্যোতি বসুর শৈশবের কিছু সময় কেটেছে। তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি বর্তমানে পাঠাগার, স্মৃতি জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও অযত্ন-অবহেলায় পুরোনো মূল ভবনটি অনেকটাই জীর্ণ হয়ে পড়েছে।
বাড়িটির দেয়ালে থাকা নামফলক অনুযায়ী, ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ১৩ অগ্রহায়ণ পাচু ওস্তাগারের মাধ্যমে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় ২ দশমিক ৪ একর জমির ওপর থাকা বাড়িটির মূল পাকা ভবনটি দোতলা।
বাড়িটি ছিল মূলত জ্যোতি বসুর নানা শরৎ চন্দ্র দাসের। তার স্ত্রী খিরদা সুন্দরীর একমাত্র সন্তান ছিলেন হেমলতা বসু। পরে হেমলতা বসুর সঙ্গে ডা. নিশিকান্ত বসুর বিয়ে হলে বাড়িটির মালিকানা তাদের পরিবারের হাতে আসে। তাদের ৩ সন্তান ছিলেন সুরেন্দ্র কিরণ বসু, জ্যোতি বসু ও সুধা বসু।
জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে বাল্যবিয়ে দেওয়ার অভিযোগ, দেনমোহর ৬০ লাখ টাকা
জ্যোতি বসুর পিতা ডা. নিশিকান্ত বসু ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। জ্যোতি বসু ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে কলকাতায় ফিরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৪৬ সালে তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ জুন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন জ্যোতি বসু।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় জ্যোতি বসু তার পৈতৃক বাড়িটিকে পাঠাগারে রূপান্তরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তার স্মৃতি সংরক্ষণে বাড়িটিকে পাঠাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২০১১ সালে পাঠাগার ও জাদুঘরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
ভবনটির প্রথম তলায় পাঠাগার ও মহাফেজখানা এবং দ্বিতীয় তলায় স্মৃতি জাদুঘর ও সেমিনার হল রাখা হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট জ্যোতি বসু স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়।
এর পাশাপাশি বাড়িটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়িতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ঘোষণা দেন। পরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে প্রায় ২ দশমিক ৪ একর জমির ওপর পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২২ সালে শেষ হয়। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
‘অস্ত্র বানান, মার্ডার হলে আমি দেখব’— তদন্তে প্রশাসন
তবে নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলেও জ্যোতি বসুর স্মৃতিবিজড়িত আদি ভবনটি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো দোতলা ভবনের বিভিন্ন অংশে জীর্ণতার ছাপ পড়েছে। দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহাসিক মূল ভবনটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের মতে, সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে জ্যোতি বসুর পৈতৃক বাড়িটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাড়িটির আদি স্থাপনা সংরক্ষণ, পাঠাগার ও জাদুঘরের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা এবং পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত হতে পারে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।
—জা. অর্থনীতি/এনজে