ফিচার ডেস্ক: নিরাপত্তা পরিষদ হলো জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যনির্বাহী অঙ্গ। বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব এই পরিষদের ওপর ন্যস্ত। জাতিসংঘের অন্য সব অঙ্গসংগঠন (যেমন: সাধারণ পরিষদ) কেবল সদস্য দেশগুলোর জন্য ‘সুপারিশ’ করতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের যেকোনো সিদ্ধান্ত বা ‘রেজল্যুশন’ মেনে চলতে সকল সদস্য রাষ্ট্র আইনত বাধ্য।
নিরাপত্তা পরিষদের গঠন, ক্ষমতা, কার্যাবলি এবং এর সীমাবদ্ধতা নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:
১. গঠন ও সদস্য কাঠামো
নিরাপত্তা পরিষদ মোট ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত। এর সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত:
• স্থায়ী সদস্য: বিশ্ব রাজনীতির শীর্ষ পাঁচটি দেশ এর স্থায়ী সদস্য। এরা কখনই পরিবর্তিত হয় না এবং এদের সবার ‘ভেটো ক্ষমতা’ রয়েছে। দেশগুলো হলো: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন এবং ফ্রান্স।
• অস্থায়ী সদস্য : বাকি ১০টি দেশ সাধারণ পরিষদের ভোটে দুই বছরের জন্য অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রতি বছর পাঁচটি করে দেশ পরিবর্তন হয়। ভৌগোলিক ভারসাম্যের ভিত্তিতে আসনগুলো ভাগ করা থাকে (যেমন: আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ইত্যাদি অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট আসন)।
o বর্তমান ২০২৬ সালের অস্থায়ী সদস্য দেশগুলো হলো: ডেনমার্ক, গ্রিস, পাকিস্তান, পানামা, সোমালিয়া (মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬-এ) এবং বাহরাইন, কলম্বিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, লাটভিয়া ও লাইবেরিয়া (মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭-এ)।
২. প্রধান ক্ষমতা ও কার্যাবলি
জাতিসংঘ সনদের ‘অধ্যায় ৭’ অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে:
• শান্তি রক্ষা ও মধ্যস্থতা: কোনো দেশে বা অঞ্চলে যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে নিরাপত্তা পরিষদ তা তদন্ত করতে পারে এবং উভয় পক্ষকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়।
• অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: কোনো দেশ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করলে বা আগ্রাসন চালালে তার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের নির্দেশ দিতে পারে।
• শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন: বিশ্বের অশান্ত অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে ব্লু হেলমেট বা ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী’ মোতায়েন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই পরিষদই নেয়।
• সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন: চরম সংকটে বা আগ্রাসন থামাতে নিরাপত্তা পরিষদ বহুজাতিক বাহিনীকে সামরিক শক্তি প্রয়োগের আইনি বৈধতা দিতে পারে।
• অন্যান্য নিয়োগ: জাতিসংঘের নতুন সদস্য গ্রহণ এবং মহাসচিব নিয়োগের জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ পাঠায় এই পরিষদ।
৩. সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও ‘ভেটো’ কী?
• নিরাপত্তা পরিষদে কোনো সাধারণ প্রস্তাব পাসের জন্য ১৫টি ভোটের মধ্যে অন্তত ৯টি ভোটের প্রয়োজন হয়।
• তবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা পদ্ধতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ৯টি ভোটের পাশাপাশি পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের সকলের সম্মতি বাধ্যতামূলক।
• ভেটো ক্ষমতা: স্থায়ী পাঁচটি দেশের কোনো একটি দেশ যদি কোনো প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় (যাকে ভেটো বলা হয়), তবে বাকি ১৪টি দেশ পক্ষে ভোট দিলেও প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়।
৪. বর্তমান বিতর্ক ও সংস্কারের দাবি
দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা সমালোচনা চলছে:
• রাজনৈতিক পক্ষাঘাত: স্থায়ী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে (যেমন: ইউক্রেন বা গাজা যুদ্ধ) কোনো একপক্ষ ভেটো দেওয়ায় পরিষদ অনেক সময় বড় সংকটে স্থবির হয়ে পড়ে।
• সংস্কারের দাবি: ১৯৪৫ সালের বিশ্বব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই P5 কাঠামো তৈরি হয়েছিল। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারত, জাপান, জার্মানি এবং ব্রাজিলের (জিফোর জোট) মতো দেশগুলো নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে।