বরগুনা প্রতিনিধি: বরগুনায় রয়েছে সপ্তাহব্যাপী সময় কাটানোর মতো সম্ভাবনাময় একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। টেংরাগিরি ম্যানগ্রোভ বন, নিদ্রা পয়েন্ট ও শুভসন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহজেই আকৃষ্ট করে পর্যটকদের। তবে দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে সম্ভাবনাময় এসব পর্যটনকেন্দ্র কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না। পরিকল্পিত উন্নয়ন করা গেলে পর্যটনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বরগুনার তালতলীতে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সুন্দরবনখ্যাত শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরি। ১৩ হাজার ৬৪৪ একর আয়তনের এ বনকে ২০১০ সালে পশু-পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। সুন্দরী, কেওড়া, গেওয়া, ছইলা, খালিসা, কাঁকড়া, গরান ও বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় সমৃদ্ধ এ বনে রয়েছে মায়াবী হরিণ, মেছোবাঘ, মিঠাপানির কুমির, বনমোরগ, বানর, কাঠবিড়ালিসহ নানা প্রজাতির প্রাণী ও পাখি।
টেংরাগিরি বনে ২০১৩ সালে নির্মাণ করা হয় ইকোপার্ক। বনের ভেতর দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার আঁকাবাঁকা ইটের সড়ক ধরে পৌঁছানো যায় বঙ্গোপসাগরের তীরে। সেখান থেকে উপভোগ করা যায় বিস্তীর্ণ সৈকত, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ইকোপার্কের বিভিন্ন স্থাপনা এখন অনেকটাই জরাজীর্ণ।
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা নিদ্রা পয়েন্ট বা নিদ্রারচর সৈকতও ইতোমধ্যে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সারি সারি ছইলা ও কেওড়া গাছের সবুজ ছায়া, প্রাকৃতিক ঘাসের গালিচা এবং প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত এ স্থানটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। তবে সেখানে যেতে হয় প্রায় এক কিলোমিটার সরু মাটির সড়ক দিয়ে। পর্যাপ্ত হোটেল, সুপেয় পানি ও ওয়াশরুম না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় পর্যটকদের।
পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর বঙ্গোপসাগরে মিলনস্থলে অবস্থিত শুভসন্ধ্যা সৈকতও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। সারি সারি ঝাউগাছ আর প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত থেকে দেখা যায় মনোরম সূর্যাস্ত। রাত্রিযাপনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের একটি ডাকবাংলো থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকেরা রাতে অবস্থান করেন না।
টেংরাগিরি ইকোপার্কটি ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এর স্থাপনাগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গেস্টহাউসও গড়ে ওঠেনি। একইভাবে নিদ্রা পয়েন্টে নেই পর্যটকদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা।
ঢাকা-কুয়াকাটা সড়ক দিয়ে আসা পর্যটকদের আমতলী থেকে এসব পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার প্রধান সড়কটিও বেশির ভাগ সময় ভাঙাচোরা থাকে। ফলে যোগাযোগের দুর্ভোগে অনেক পর্যটক একবার ঘুরে এসে দ্বিতীয়বার আর আসতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে। পর্যটকদের অভিযোগ, সঠিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সম্ভাবনাময় এসব পর্যটনকেন্দ্র জৌলুশ হারাচ্ছে।
নিদ্রারচর সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক সোনিয়া আক্তার বলেন, “স্থানটি অত্যন্ত সুন্দর। এখানে ঘুরতে ও সময় কাটাতে ভালো লাগে। কিন্তু ওয়াশরুম না থাকায় নারী ও শিশুদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দ্রুত আধুনিক ওয়াশরুম নির্মাণ করা জরুরি।”
পর্যটন ব্যবসায়ী নাঈম হোসেন বলেন, “বর্তমানে তালতলীর পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আমি অনেক সময় কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। বিশেষ করে যোগাযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ভাঙাচোরা।”
বরগুনা জেলা ট্যুরিস্ট ম্যানেজমেন্টের সভাপতি আরিফ রহমান বলেন, “তালতলীর এই অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সরকারি জমি বরাদ্দ ও ঋণ দিয়ে হোটেল-মোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এতে পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং এই অঞ্চলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে।”
বন বিভাগের সাকিনা বিট কর্মকর্তা রহিমুল ইসলাম জুমেল বলেন, “টেংরাগিরি ইকোপার্কের স্থাপনাগুলো সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে টেংরাগিরি ইকোপার্কের সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।”
বরগুনা জেলা প্রশাসক তছলিমা আক্তার বলেন, “তালতলীর পর্যটন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটকবান্ধব করে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। বৃহৎ উন্নয়নের জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। পাশাপাশি ছোটখাটো সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ওলি উল্লাহ বলেন, “আমার নির্বাচনী ওয়াদা ছিল বরগুনার পর্যটন স্পটগুলোকে আধুনিকায়ন করা। তাই পর্যটন মন্ত্রণালয়কে বরগুনার নয়নাভিরাম এসব পর্যটন স্পটকে বিশ্বমানের পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে অবহিত করব। আশা করি, বড় একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে বরগুনার পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে পারব।”
—জা. অর্থনীতি/এলএটি