জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নেপালের উত্তর রসুয়ার ভোতেকোশী নদী। ২৬ আগস্ট সকালে হঠাৎ প্রায় ১০ মিটার উঁচু পানির ঢল তিমুরে ও সিয়াব্রুবেসি এলাকায় আছড়ে পড়ে। এতে বহু বসতি ধ্বংস হয়। কাস্টমসের অবকাঠামো ভেসে যায়। পুলিশ ফাঁড়ি ভেঙে পড়ে। জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের প্রধান বাণিজ্যপথের ওপর নতুন নির্মিত কয়েকটি সেতুও ধ্বংস হয়ে যায়।
ঘটনাটিকে হয়তো ‘নজিরবিহীন জলবিদ্যাগত ঢল’ বলা হবে। কিন্তু একই এলাকায় এক দশকের মধ্যে যদি বারবার এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তাকে আর আকস্মিক বলা যায় না। একে বলা যায় দুর্বল পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদর্শিতার অভাব।
এখনো এমন একটি জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে দেশ গড়া হচ্ছে, যে জলবায়ু আর আগের মতো নেই। কাঠমান্ডুর যেকোনো পরিকল্পনা বা কৌশলগত নথি দেখলেই একটি বিষয় স্পষ্ট হবে। তা জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা, সড়ক সম্প্রসারণের নকশা বা বিদেশি সহায়তায় পরিচালিত গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প—যাই হোক না কেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা করা হয় গড় হিসাব ধরে। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত, গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং নদীর গড় পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে অবকাঠামো তৈরি করা হয়।
নেপালের বন্যায় নিহত বেড়ে ৬১৬, নিখোঁজ ১৯২৪
গড় হিসাব করলে জটিল প্রকৃতিকে কাগজে-কলমে সহজ বলে মনে হয়। ৫ বছরের প্রকল্প বাজেট তৈরি করা সহজ হয়। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণাও পাওয়া যায়।
কিন্তু নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি গড় হিসাব মেনে চলে না। শুধু ত্রিশূলী করিডরে স্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টির কারণে রসুয়ার কোনো পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়ে না। গড় বৃষ্টিপাতের কারণে কোনো সেতুর পাড়ও ভেঙে যায় না। বিপদ ঘটে তখন, যখন উঁচু পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ প্রচণ্ড ঢল নামে। যখন কয়েক মাসের সমান পানি কয়েক মিনিটের মধ্যে সরু গিরিখাতে নেমে আসে, তখন নদীর স্বাভাবিক রূপ পুরোপুরি বদলে যায়।
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরও বড় প্রভাব হলো আবহাওয়ার চরম ভাব বাড়ছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়াই নেপালের পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা।
নেপালের বন্যায় ৭ মরদেহ ভেসে এলো ভারতে
প্রচলিত প্রকৌশল পদ্ধতিতে অতীতের গড় হিসাব ধরে অবকাঠামোর নকশা করা হয়। কিন্তু নেপালের মতো অস্থির পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে শুধু গড় হিসাব অনেক সময় কোনো কাজে আসে না।
প্রশ্ন হলো, স্বাভাবিক অবস্থার বাইরে কোনো ঘটনা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। পরিসংখ্যানের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন’ বা ‘মান বিচ্যুতি’। সহজভাবে বললে গড় অবস্থা থেকে কোনো ঘটনা কতটা বেশি বা কম দূরে সরে যেতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অবকাঠামো শান্ত দিনে ধ্বংস হয় না। কিন্তু একটি সেতু বা নদীর পাশের মহাসড়ক যদি শুধু স্বাভাবিক গড় পরিস্থিতি মাথায় রেখে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি মূলত শান্ত দিনের কথা ভেবে তৈরি হচ্ছে। ফলে তা ভেঙে পড়ে অস্বাভাবিক ও চরম কোনো ঘটনার সময়। তখন গড় হিসাব ধরে তৈরি অবকাঠামো টিকতে পারে না।
নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত ১৭, নিখোঁজ ৪০০
এই পরিসংখ্যানগত ভুলের কারণে কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত বিপুল সরকারি অর্থ নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে হাজার হাজার মানুষের জীবনে।
তীব্র ঝড় বা হিমবাহের হ্রদ ফেটে সৃষ্ট বন্যার সময় নদীর পানিপ্রবাহ অতীতের গড় হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হয়। তখন ড্রেন উপচে পড়ে, কালভার্ট ভেঙে যায়, প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে নদীতে পড়ে। প্রতিবছর একই জায়গায় একই নকশায় এবং একই গড় হিসাব ধরে একই সেতু আবার নির্মাণ করা মানে একই ক্ষতি বারবার ডেকে আনা।
এই চক্র ভাঙতে হলে সরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রথমত, পাহাড়ি যোগাযোগপথের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুধু গড় হিসাব ধরে অবকাঠামোর নকশা করা বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় সড়ক থেকে বড় মহাসড়কের সেতু পর্যন্ত সবকিছু চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি মাথায় রেখে তৈরি করতে হবে। অনুমোদনের আগে ১০০ বছরের সম্ভাব্য বৈচিত্র্যের মডেল ধরে সেগুলোর সক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। অতীতের গড় বৃষ্টিপাতের বদলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি নামার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
নেপালে নিখোঁজ পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৪
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও আঞ্চলিক পরিকল্পনাকারীদের প্রকল্প মূল্যায়নের পদ্ধতি বদলাতে হবে। গড় তথ্যের ভিত্তিতে নদীর তীর স্থিতিশীল হয়েছে বা স্থানীয় অর্থনীতি ১৫ শতাংশ বেড়েছে—এ ধরনের সাফল্য যথেষ্ট নয়। ৬ মাস পর যদি একটি বড় বন্যা পুরো উপত্যকা ধ্বংস করে দেয়, তাহলে সেই উন্নয়নের অর্থ কী?
প্রকল্পের মূল্যায়নে দেখতে হবে, বড় ধরনের দুর্যোগের সময় সেই বিনিয়োগ কতটা টিকে থাকতে পারে।
সবশেষে, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বদলে দুর্যোগের আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ভূমিধসে নদী আটকে যাওয়ার পর জরুরি অর্থ ছাড় করা অনেক ব্যয়বহুল। অস্বাভাবিক আবহাওয়া বা উজানে আকস্মিক বন্যার লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কতা ও জরুরি অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষ বিপদ আসার আগেই নিজেদের সম্পদ রক্ষার সুযোগ পাবে।
নেপালের ভূপ্রকৃতি নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু শুধু প্রকৃতিই নেপালের সড়ক ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে না। বর্তমান পরিকল্পনা ব্যবস্থাও এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী। কারণ, পরিকল্পনাকারীরা এখনো এমন একটি স্বাভাবিক ও মাঝারি পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করছেন, যা আর আগের মতো নেই।
চীনের সতর্কতা: কৃত্রিম হ্রদ উপচে ফের ভাসতে পারে নেপাল
একটি সেতু বা জলবায়ু অভিযোজন নীতি ৯৯ দিন ভালোভাবে কাজ করলেও কোনো লাভ নেই, যদি শততম দিনে ভয়াবহ বন্যার মুখে সেটি ভেঙে পড়ে। তাই এখন গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চরম ও অস্বাভাবিক ঘটনার ঝুঁকি মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে।
যেসব ঘটনাকে আজ নজিরবিহীন বা ব্যতিক্রমী বলা হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবে বারবার ঘটছে। তাই এগুলো আর সত্যিকারের নজিরবিহীন নয়।
