রেকর্ডের পাহাড় ভেঙে হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি

ক্রীড়া প্রতিবেদক, ঢাকা: এক প্রান্তে উইকেট পড়ছে, অন্য প্রান্তে একজন দাঁড়িয়ে লড়ছেন বুক চিতিয়ে! সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মাঝেও তার চোখে ছিল না কোনো অস্থিরতা। কখনও রক্ষণ, কখনও পাল্টা আক্রমণ-ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সব পরিকল্পনা যেন একাই পড়ে ফেলেছিলেন তাওহীদ হৃদয়। শেষ পর্যন্ত তার ব্যাটের সামনে হার মানতে হলো ক্যারিবীয় বোলারদের। যে ইনিংস শুরু হয়েছিল দলকে বিপদ থেকে বাঁচানোর তাগিদে, সেটিই শেষ হলো বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহের রেকর্ড গড়ে।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনটি গতকাল হয়ে থাকল হৃদয়ের নামে। ৩৫৯ বলের ইনিংসে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় অপরাজিত ২৪২ রান করেছেন তিনি। তার একার রানেই যেন আলাদা একটি ইনিংস খেলেছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের জবাবে ৩৮৬ রান তুলে তখন ৩০ রানের লিডও পেয়ে যায় স্বাগতিকরা।

অথচ দিনের শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এমন পরিণতি কল্পনা করাও কঠিন ছিল। তিন উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে দিন শুরু করা দলটি একপর্যায়ে হারিয়ে ফেলে সাত উইকেট। স্কোরবোর্ডে ১৮৪ রান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে পিছিয়ে ১৭২ রানে। তখন বাংলাদেশের সামনে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কাই ছিল বেশি। কিন্তু হৃদয় যেন অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন।

মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়ে দলকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিলেন। মুশফিক ৩৪ রানে ফিরলে সেই স্বস্তি আবার উধাও। লিটন দাসও টিকতে পারেননি। মিরাজের ১৬ রানও বড় কোনো ভরসা হয়ে ওঠেনি। হাসান মাহমুদের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ইনিংসের শেষ দিকটা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তখনও ক্রিজে হৃদয়, কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো ব্যাটার বলতে বাকি তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ।

সেখান থেকেই শুরু হয় হৃদয়ের আসল পরীক্ষা। তাইজুলকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ১১৭ রান যোগ করেন তিনি। ৫৬ বলে ২২ রান করে তাইজুল বিদায় নিলেও তার সঙ্গে গড়া জুটিটি বাংলাদেশের ইনিংসে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয়। এরপর তাসকিনকে নিয়ে নবম উইকেটে আরও ৮৫ রান যোগ করেন হৃদয়। শেষ দিকের এই দুই জুটিতেই পাল্টে যায় ম্যাচের হিসাব।

হৃদয়ের ব্যক্তিগত ইনিংসও তখন অন্য মাত্রা পাচ্ছিল। দিনের শুরুতে তার রান ছিল ২৯। সেখান থেকে এক দিনেই যোগ করেন ২১৩ রান। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক দিনে কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ রান এটি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব আল হাসানের করা ২১২ রানের রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন তিনি।

এরপর এলো সেই মুহূর্ত, যা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে আলাদা করে মনে রাখা হবে। জোমেল ওয়ারিকানের বলে চার মেরে মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান হৃদয়। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গড়া মুশফিকের সেই রেকর্ড টিকে ছিল আট বছর। এবার সেটিকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের মালিক হৃদয়।

তবে রেকর্ডের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে পরিণত করেছেন তিনি। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটার এর আগে এমন কীর্তি গড়তে পারেননি। টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা দেশের চতুর্থ ব্যাটারও এখন হৃদয়। তার আগে এই কীর্তি ছিল মুশফিক, সাকিব ও তামিমের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিও এটি।

ইনিংসে ১১টি ছক্কা মেরে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন হৃদয়। এর আগে সাতটি ছক্কা মেরে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন তামিম ইকবাল। ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় বাউন্ডারি থেকেই এসেছে ১৫৪ রান। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে সর্বোচ্চ রানও এটি।

আরেকটি পরিসংখ্যান হৃদয়ের ইনিংসের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে তার একার অবদান ২৪২। দলের মোট সংগ্রহের ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশই এসেছে তার ব্যাট থেকে। একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ অবদান এটি। অন্য কোনো ব্যাটার ৩৫ রানও করতে পারেননি। এমন এক ইনিংসে হৃদয় কার্যত একাই সামলেছেন পুরো দলের দায়িত্ব!

এমন ঐতিহাসিক ইনিংসের পেছনে হৃদয়ের নিজেরও ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা ও বিশ্বাসের গল্প। ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিষেক নিয়ে স্বপ্ন ছিল অনেক। কিন্তু ব্যর্থতা এবং হতাশায় জেদ চেপেছিল খুব। তবে বিশ্বাস ছিল আল্লাহ এবং নিজের পরিশ্রমের প্রতি। মহান আল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি আশা পূরণ করলেন। আলহামদুলিল্লাহ।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল জোমেল ওয়ারিকান। ১০৪ রান দিয়ে চার উইকেট নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তার চার উইকেটও বাংলাদেশের ইনিংসকে আটকে রাখতে পারেনি। হৃদয়ের সঙ্গে শেষ দিকের ব্যাটারদের জুটিগুলোই ক্যারিবীয়দের ওপর চাপ ফিরিয়ে দেয়।

ব্যাটিংয়ের এই অসাধারণ দিন শেষে হৃদয়ের সামনে অবশ্য আরও একটি চ্যালেঞ্জ। ৩০ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দিনের শেষ চার ওভারে বিনা উইকেটে সাত রান করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এখনও ২৩ রানে পিছিয়ে সফরকারীরা। চতুর্থ দিনে তাদের দ্রুত থামাতে পারলে হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংসের পূর্ণ প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের সামনে।

প্রথম টেস্টের হতাশা, ব্যর্থতা আর সমালোচনা পেছনে ফেলে হৃদয় যেন নিজের নতুন পরিচয় তৈরি করলেন সিলেটে। মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমে এমন ইনিংস, এমন রেকর্ড— সব মিলিয়ে এটি তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক দিন। দিন শেষে স্কোরবোর্ডে ২৪২ রানে অপরাজিত একটি নাম। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন এক উচ্চতা।

হৃদয় ছোঁয়া ইনিংস গড়ে হৃদয় নিজেই বলেছেন, ব্যর্থতা ও হতাশা তাকে জেদি করে তুলেছিল। বিশ্বাস রেখেছিলেন সৃষ্টিকর্তা ও নিজের পরিশ্রমের ওপর। সিলেটে সেই বিশ্বাসেরই যেন প্রতিদান পেলেন। আর বাংলাদেশ পেল এমন এক ইনিংস, যা শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের হিসাব বদলায়নি, বদলে দিয়েছে দেশের টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ড বইও!

হৃদয়ের ইনিংসে যত রেকর্ড-
* বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস (২৪২*)
* মুশফিকের ২১৯ রানের রেকর্ড ভেঙেছেন।
* বাংলাদেশের চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরিয়ান।
* প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অভিষেক সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরি।
* বাংলাদেশের হয়ে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১১ ছক্কার রেকর্ড।
* ইনিংসে বাউন্ডারি থেকে ১৫৪ রান।
* শেষ তিন উইকেটে বাংলাদেশের রেকর্ড ২০২ রান।