বিশ্বের মানচিত্রে ব্রাজিল মানেই ফুটবল, সাম্বা নাচ আর আমাজনের সবুজ অরণ্য। কিন্তু এই চিরচেনা রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রক্তভেজা, বেদনাভিধুর এবং গৌরবময় ইতিহাস। আটলান্টিকের এপারে যখন ইউরোপীয় উপনিবেশের সূচনা হচ্ছিল, ঠিক তখনই ব্রাজিলের মাটিতে পড়েছিল ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন। তবে সেই আগমন আনন্দের ছিল না; তা ছিল দাসত্ব, নির্মম নির্যাতন আর শিকল ভাঙার সংগ্রামের এক জীবন্ত মহাকাব্য। আজ চলুন জেনে নেওয়া যাক লাতিন আমেরিকার এই বৃহত্তম দেশে ইসলামের আলো ছড়ানোর নেপথ্যে মুসলিমদের সেই অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের গল্প।
১৬ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো আলভারেস কারব্যালের হাত ধরে যখন ব্রাজিল আবিষ্কৃত হয়, তখন তার বহরে ছিলেন শিহাবুদ্দিন ইবনে মাজেদ ও মুসা ইবনে সাতির মতো দক্ষ মুসলিম নাবিক। তবে ব্রাজিলে ইসলামের প্রকৃত বিস্তার ঘটে আফ্রিকান দাসদের মাধ্যমে। পর্তুগিজ শাসকেরা লাখ লাখ আফ্রিকান মুসলমানকে জাহাজে করে পশুর মতো বেঁধে ব্রাজিলে নিয়ে আসে।
ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরের নথিপত্র সাক্ষ্য দেয়, এই দাসদের অনেকেই ছিলেন হাফেজে কুরআন, আলেম ও সুশিক্ষিত। দিনের বেলা মালিকের চাবুকের আঘাত সহ্য করেও তারা রাতে গোপনে আরবি শিখতেন, বালিতে আঙুল দিয়ে লিখে শিশুদের কুরআন শেখাতেন। শত নির্যাতনের মাঝেও তারা নিজেদের ঈমানি পরিচয় বিলীন হতে দেননি।
নির্যাতনের সীমা যখন ছাড়িয়ে যায়, তখন গর্জে ওঠেন মুসলমানেরা। ১৬০৫ সালে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলীয় আলমিরস এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তরুণ মুসলিম নেতা জানজা জুম্বার নেতৃত্বে সেখানে গড়ে ওঠে এক স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই মুসলিম রাজ্যটি পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রেখেছিল।
১৬৯৪ সালে পর্তুগিজদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে আলমিরসের পতন ঘটলেও, এটি ছিল জবরদস্তিমূলক খ্রিষ্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে মুসলিমদের বীরত্বগাথার এক অনন্য দলিল। ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ওপর এই দমন-পীড়ন জারি ছিল।
১৯ শতকের শেষভাগ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আরব-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে লেবানন, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিমের ব্রাজিলে আগমন।
২০০০ সাল-বর্তমান, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে মসজিদের সংখ্যা চার গুণ বেড়ে প্রায় ১৩০টিতে পৌঁছেছে।
বর্তমান অবস্থান, দেড় লাখেরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে মুসলমানরা আজ ব্যবসা, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
আজকের ব্রাজিলে রিও ডি জেনিরো, সাও পাওলো ও পারানা অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মুসলিম কমিউনিটি। একসময় যেখানে নামাজ পড়া ছিল অপরাধ, আজ সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন সব মসজিদ ও ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ব্রাজিল সরকারও এখন এই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
ব্রাজিলের মুসলমানদের এই ইতিহাস কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার মাঝেও কীভাবে ঈমান ও আত্মমর্যাদা বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তার এক জীবন্ত উদাহরণ। দাসত্বের অন্ধকার খাঁচা থেকে বেরিয়ে আজ তারা দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক নেতৃত্বের অন্যতম চালিকাশক্তি।
জা. অর্থনীতি/ উমার