এনামুল হক, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ): একসময় কারখানার সাইরেন আর শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। সেই শিল্পাঞ্চলে এখন হতাশা ও অনিশ্চয়তা। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়েছেন হাজারো শ্রমিক। এর প্রভাবে সংকটে পড়েছে বাড়িভাড়া, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন খাত। বিপর্যস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি।
রূপগঞ্জের বাসিন্দা শিল্পী বেগমের জীবনেও নেমে এসেছে দুর্ভোগ। তিন সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারানোর পর গাজী টায়ার কারখানায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরিই ছিল তার আয়ের একমাত্র উৎস। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সন্তানদের নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের আগে ও পরে রূপগঞ্জে অন্তত ১২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজী টায়ার, ডিজনি সোয়েটার, বি ব্রাদার্স, মারকুয়েন্টাল, মাহাবুব স্পিনিং, জয়া গার্মেন্টস, সজীব গার্মেন্টস, নোয়াব স্পিনিং, অন্তিম নিটিং অ্যান্ড ডাইং ও বাংলাদেশ এক্সপোর্ট। কাজ হারিয়ে শ্রমিকেরা নতুন কর্মসংস্থানের সন্ধানে এক কারখানা থেকে অন্য কারখানায় ঘুরছেন। অনেকে পেশা বদলে দিনমজুরের কাজ করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমজীবী পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
শ্রমিকদের কর্মহীনতার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। শ্রমিকেরা এলাকা ছাড়ায় আবাসিক ভবনে ভাড়াটের সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করা মালিকেরা কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। ক্রেতা কমে যাওয়ায় দোকানিরা পুঁজি হারাচ্ছেন, আর যাত্রী সংকটে আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছেন সিএনজি ও অটোরিকশাচালকেরা।
এদিকে চালু থাকা কারখানাগুলোও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ওয়ান পোলার লিমিটেড গার্মেন্টসের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, চাহিদার তুলনায় মাত্র ৭০ শতাংশ গ্যাস ও ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আরও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিক জানান, আইনি জটিলতায় কিছু কারখানা বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পমালিকদের স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে বন্ধ কারখানাগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা।