ট্রাম্পের ভুলের মাশুল: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়
ছবি সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের চুক্তি সম্পাদনের পর পরিচালিত প্রথম বড় এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে মার্কিন জনগণের চরম অসন্তোষ ও হতাশার চিত্র। দেশটির সিংহভাগ নাগরিক মনে করছেন, ট্রাম্পের উচিত আর কোনো শর্তের জন্য চাপ না দিয়ে দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করা। তবে মার্কিনরা এই চুক্তিকে পছন্দ করছেন বলে এমনটা ভাবছেন না; বরং তারা ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধকে একটি চরম বিপর্যয় বলে মনে করেন এবং যেকোনো মূল্যে এর অবসান চান।

‘সিবিএস নিউজ-ইউগভ’-এর নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনরা এই যুদ্ধের শেষ দেখার একটি প্রাথমিক আভাস পেলেও, যুদ্ধ নিয়ে তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিন্দুমাত্র বদলায়নি।

মার্কিনরা মনে করছেন এটি একটি খারাপ চুক্তি
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন যেকোনো উপায়ে যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র ২২ শতাংশ নাগরিক আরও অপেক্ষা করার পক্ষে, যাতে ইরানকে বেশি ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়।

চুক্তিটির মূল্যায়নের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মাত্র ২২ শতাংশ মার্কিন বলেন, এটি ইরানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশি লাভজনক হয়েছে। বিপরীতে ৩৭ শতাংশ মানুষের মতে, চুক্তিটি ইরানের জন্য বেশি সুবিধাজনক হয়েছে এবং ৪১ শতাংশ মনে করেন চুক্তিটি উভয় পক্ষের জন্যই সমান হয়েছে। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেন তার প্রশাসন এই আলোচনায় জয়ী হয়েছে।

কৌশলগত পরাজয় ও পারমাণবিক ইস্যু
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। কিন্তু জরিপ বলছে, ৬৯ শতাংশ মার্কিন এবং খোদ রিপাবলিকান দলের ৪৫ শতাংশ কর্মী মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করার জন্য এই চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও তা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামাতে পারবে না।

গত জুনের মাঝামাঝি ‘ফক্স নিউজ’-এর করা একটি জরিপেও ৬৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছিলেন, এই শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা যাবে না। এছাড়া, ৬৮ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত হলেও ইরান অন্য দেশগুলোকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করবে না।

যুদ্ধকে উল্টো ক্ষতিকর মনে করছেন মার্কিনীরা
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছিলেন যে, এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু মাত্র ৩৭ শতাংশ মার্কিন মনে করেন যে যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে ইরান এখন দুর্বল হয়েছে। বিপরীতে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরও বেশি (৬৩ শতাংশ) মার্কিন মনে করেন, ইরান আগের মতোই শক্তিশালী আছে অথবা আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

জরিপে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, এই যুদ্ধ আসলে সমস্যার সমাধান করার চেয়ে নতুন নতুন সমস্যা বেশি তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখার যে ক্ষমতা তেহরান দেখিয়েছে, তা তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। আর এ কারণেই মার্কিনরা মনে করছেন, আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধের বড় মাশুল গুনে যেতে হবে।

কিসের মধ্যে জড়াচ্ছেন, বুঝতে পারেননি ট্রাম্প
জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে। এই মতের পক্ষে রিপাবলিকান দলের ৫১ শতাংশ কর্মীও সায় দিয়েছেন। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করার মতো সক্ষমতা ও সাহস দেখাবে, ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে তা খাটো করে দেখেছিল।

যেকোনো মূল্যে অবসান চান মার্কিনরা
ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে বলেছিল এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু তা দেখতে দেখতে প্রায় চার মাস পার করে ফেলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে মার্কিনরা তেমন কোনো বড় সাফল্য বা অর্জন দেখতে পাননি।

সিবিএসের জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে সব লক্ষ্য পূরণ করতে পেরে এই চুক্তিতে পৌঁছায়নি; বরং তারা এখন যেকোনো মূল্যে এই দীর্ঘায়িত সংঘাত ও ঝামেলার দ্রুত সমাপ্তি টানতে চাইছে।

সূত্র: সিএনএন

—জা. অর্থনীতি/এলএটি