সাহিত্য ও সিনেমায় বিশ্বকাপ ফুটবল
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

দীপান্ত রায়হান: বিশ্বকাপ ফুটবল কেবলই কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি এই গ্রহের সবচেয়ে বড় ও প্রভাববিস্তারী সাংস্কৃতিক উৎসব। চার বছর পর পর এক মাসের জন্য পুরো পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে। ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি কিংবা জাতিগত বিভাজনের সমস্ত দেয়াল ভেঙে ফুটবল বিশ্বকাপ রূপ নেয় মানুষের সামষ্টিক আবেগ, স্বপ্ন, পরাজয় ও বিজয়ের এক জীবন্ত মহাকাব্যে। আর এই তীব্র মানবিক আকুলতার কারণেই বিশ্বকাপকে ঘিরে যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, উপন্যাস, গল্প, কবিতা ও গান। সাহিত্য ও বিনোদন জগৎ বরাবরই এই বৈশ্বিক উন্মাদনাকে নিজেদের সৃজনশীল ক্যানভাসে ধারণ করতে চেয়েছে।

১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মাঠে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় সবুজ গালিচার সীমানা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়েছে রূপালি পর্দায়, নাটকের সংলাপে, উপন্যাসের গূঢ় চরিত্রে, এমনকি চিরন্তন প্রেমের গল্পেও। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা আজ শতাধিক; আর ফুটবলকে উপজীব্য করে লেখা উপন্যাস, স্মৃতিকথা ও গল্পের সংখ্যা তো হাজার ছাড়িয়েছে।

বিশ্বকাপভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে তথ্যচিত্র বা প্রামাণ্যচিত্রের প্রসঙ্গ। ফিফা প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপ নিয়েই তৈরি করেছে তাদের অফিসিয়াল ডকুমেন্টারি। ১৯৬৬ সালের ‘গোল!’, ১৯৭০ সালের ‘হিরোজ অব মেক্সিকো’, ১৯৯৪ সালের ‘টু বিলিয়ন হার্টস’ কিংবা ২০১৪ সালের ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান টিম’— এই চলচ্চিত্রগুলো কেবল মাঠের স্কোরের খতিয়ান নয়, বরং ফুটবল-উন্মাদনার সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোড়নকেও নিখুঁতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে।

কাহিনিচিত্রের ক্ষেত্রেও বিশ্বকাপের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ছবি ‘গোল!’ বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসের এক দরিদ্র তরুণের বিশ্বমানের ফুটবলার হয়ে ওঠার সেই রূপকথা দর্শকদের আবেগ ভীষণভাবে নাড়া দেয়। যদিও এটি সরাসরি বিশ্বকাপ নিয়ে নয়, তবু আন্তর্জাতিক ফুটবলের যে স্বপ্ন, তার সঙ্গে বিশ্বকাপের আবহ এখানে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

ফুটবল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ নিয়ে নির্মিত আরেকটি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ (১৯৮১)। সিলভেস্টার স্ট্যালোন, মাইকেল কেইন এবং খোদ ফুটবল সম্রাট পেলের অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই ছবিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি। এখানে ফুটবল আর কেবল বিনোদন নয়, হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের এক অমোঘ প্রতীক।

লাতিন আমেরিকার, বিশেষ করে আর্জেন্টিনার সিনেমায় ফুটবল এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। দিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিয়ে নির্মিত আসিফ কাপাডিয়ার ‘দিয়েগো ম্যারাডোনা’ বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে ব্রাজিলের কালো মানিককে নিয়ে তৈরি ‘পেলে: বার্থ অব আ লিজেন্ড’ চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বস্তির এক কিশোরের বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য আখ্যান। এই বায়োপিকগুলোতে বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; বরং জাতীয় পরিচয়, শ্রেণিসংগ্রাম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার এক পরম যুদ্ধ।

বিশ্বকাপ ফুটবলের এই জাদুকরী আবেশ সাহিত্যকেও করেছে সমৃদ্ধ। উরুগুয়ের প্রখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানোর ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ ফুটবল-সাহিত্যের এক অনন্য বাইবেল। গালেয়ানো ফুটবলকে দেখেছেন ইতিহাস, রাজনীতি ও নান্দনিক শিল্পের মিশেলে। অন্যদিকে ব্রিটিশ লেখক নিক হর্নবির ‘ফিভার পিচ’ ফুটবলভক্তির মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা অন্যতম সেরা বই। এটি মূলত ক্লাব ফুটবলকেন্দ্রিক হলেও, বৈশ্বিক আসরের সেই চেনা আবেগ সেখানে বারবার ফিরে এসেছে।

ফুটবল নিয়ে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে যে পরিমাণ মন্থন হয়েছে, পৃথিবীর আর কোথাও তা বিরল। আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস ফুটবলকে খুব একটা পছন্দ না করলেও, তার কথাসাহিত্যে অবধারিতভাবেই এসেছে এই প্রসঙ্গ। বিপরীতে, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস ফুটবলকে দেখতেন লাতিন আমেরিকার মানুষের স্বপ্নের নিজস্ব ভাষা হিসেবে। আবার ব্রাজিলিয়ান জাদুকর পাওলো কোয়েলহোও জীবনের গূঢ় সংগ্রামকে ফুটবলের রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন বিভিন্ন লেখায়।

আমাদের বাংলা সাহিত্যেও ফুটবল ও বিশ্বকাপের ঢেউ কম আছড়ে পড়েনি। হ‍ুমায়ূন আহমেদের লেখায় বিশ্বকাপ উন্মাদনার চেনা চিত্রকল্প পাওয়া যায় বারবার। তার নাটক ও উপন্যাসে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্তের পারিবারিক হাস্যরস ও সামাজিক বাস্তবতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালও কিশোরদের জন্য লিখেছেন ফুটবলভিত্তিক রোমাঞ্চকর গল্প। এছাড়া ওপার বাংলার সমরেশ মজুমদার ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখনীতেও ফুটবলের এই বাঙালি আবেগ দারুণভাবে মূর্ত হয়েছে।

কবিতার নিটোল ছন্দেও বন্দি হয়েছে ফুটবল। পাকিস্তানি কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা পর্যন্ত অনেক কালজয়ী কবি ফুটবলকে মানুষের সম্মিলিত দ্রোহ ও আবেগের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ এলে সাময়িকী ও পত্রপত্রিকায় ফুটবলভিত্তিক কবিতা, রম্যরচনা ও স্মৃতি রোমন্থনের ঢল নামে।

বিনোদন ও পপ সংস্কৃতির সঙ্গে ফুটবল বিশ্বকাপের আধুনিক রসায়নটা আরও জমকালো। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এখন অলিম্পিকের সমতুল্য এক মহিমান্বিত সাংস্কৃতিক কোলাজ। শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’, রিকি মার্টিনের ‘দ্য কাপ অব লাইফ’ কিংবা কে’নানের ‘ওয়াভিন ফ্ল্যাগ’— এই গানগুলো বিশ্বকাপকে বিশ্বজনীন পপ সংস্কৃতির অংশ করে তুলেছে, যা যুগের সীমানা পেরিয়ে এক একটি প্রজন্মের নস্টালজিয়া হয়ে বেঁচে থাকে।

হলিউড থেকে বলিউড তারকাদের গ্যালারিও এই উন্মাদনা থেকে মুক্ত নয়। শাহরুখ খান, রণবীর কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন কিংবা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর মতো তারকারা যখন প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়ান, তখন তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি মানুষের আলোচনার খোরাক জোগায়। বাংলাদেশেও বিশ্বকাপ এলে শহর থেকে গ্রামে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার যে যুদ্ধ চলে, তা বিশ্বের দরবারে এক অনন্য নজির। নাটক, টকশো, বিশেষ ক্রোড়পত্র আর টেলিভিশন স্ক্রিন— সবকিছুই তখন চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ফুটবলের দখলে চলে যায়।

আসলে ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর ভেতরের লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো। কোনো এক অচেনা তরুণের রাতারাতি ট্র্যাজিক হিরো হয়ে ওঠা, ছোট্ট কোনো দেশের পরাশক্তিদের হারিয়ে রূপকথা লেখা, কিংবা কোনো জীবন্ত কিংবদন্তির অশ্রুসিক্ত বিদায়— এই মানবিক গল্পগুলোই চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের জন্য অন্তহীন উপাদানের জোগান দেয়।

শেষ বিচারে ফুটবল বিশ্বকাপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষ কেবল রুটি-রুজির চাকা ঘোরাতেই বাঁচে না; সে বাঁচে কিছু যৌথ স্বপ্ন, তীব্র আবেগ আর রূপকথার গল্পের জন্যও। আর সেই গল্পগুলোই কখনও সেলুলয়েডের ফিতেয় সিনেমা হয়ে ওঠে, কখনও উপন্যাসের পাতা ছুঁয়ে যায়, আবার কখনও সুরের মূর্ছনায় গান হয়ে ফেরে। ফুটবল তখন আর কেবল চৌকো মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের খেলা থাকে না; তা হয়ে ওঠে এই মর্ত্যের সবচেয়ে বড় মানবিক নাট্যমঞ্চ।