জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ২৪ অক্টোবর। জন্মদিনের জমকালো আয়োজনে চলচ্চিত্র তারকা, বন্ধু আর সাংবাদিকদের নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছেন পরীমনি। কিন্তু মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে সেই সাংবাদিকদের সঙ্গেই তার তুমুল বিরোধ! আদালত প্রাঙ্গণে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, গালিগালাজ; এমনকি নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে আহত হয়েছেন সংবাদকর্মী ও বিচারপ্রার্থীও। অভিযোগের মুখে যে সাংবাদিক, তার একটি হাত কার্যত অকার্যকর। অন্য হাতেই সামলান ক্যামেরা, বুম, ট্রাইপড। কী ঘটেছিল সেদিন আর পরীমনিকে ঘিরে বিতর্কের শুরুই বা কোথায়
বোট ক্লাবের সেই রাত, যেখান থেকে শুরু বড় বিতর্ক
২০২১ সালের ৮ জুন। সাভারের বিরুলিয়ায় ঢাকা বোট ক্লাবে যান পরীমনি। সঙ্গে ছিলেন কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি, তুহিন সিদ্দিকী অমি এবং আরও একজন। পরীমনির অভিযোগ, পূর্বপরিচিত অমি পরিকল্পিতভাবে তাকে সেখানে নিয়ে যান। একপর্যায়ে, বোট ক্লাবের তৎকালীন নির্বাহী সদস্য ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন, মারধর করেন এবং হত্যার হুমকি দেন। তার দাবি, জোর করে মদ পান করানোর চেষ্টাও করা হয়।
ঘটনার চার দিন পর, ১৩ জুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চান পরীমনি। নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। পরদিন ১৪ জুন সাভার থানায় ধর্ষণচেষ্টা, হত্যাচেষ্টা ও মারধরের অভিযোগে মামলা করেন। ওই দিনই নাসির উদ্দিন ও অমিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে নাসিরের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, দামি মদ নেওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে পরীমনি উত্তেজিত হয়ে তাকে আক্রমণ করেন। ফলে শুরু থেকেই দুই পক্ষের বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয় ব্যাপক বিতর্ক।
পুলিশ তদন্ত শেষে নাসিরসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। কিন্তু, বোট ক্লাবের সেই ঘটনা শেষ পর্যন্ত আটকে থাকেনি শুধু একটি মামলায়।
বোট ক্লাবের পর গ্রেপ্তার, কারাগার থেকে ফিরে নতুন লড়াই
২০২১ সালের ৪ আগস্ট। বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় পরীমনিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। কয়েক দফা রিমান্ড ও কারাবাসের পর ১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
এদিকে বোট ক্লাবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি আইনি লড়াই। নাসির উদ্দিনও পরীমনি এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে মামলা করেন।
২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি এই মামলায় পরীমনি ও তার সহযোগী জিমির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। পরীমনি সেদিন হাজির না হওয়ায় জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। পরে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তিনি।
২৪ অক্টোবর, জন্মদিনে সাংবাদিকদের নিয়ে উৎসব
এবার আসা যাক সাম্প্রতিক সময়ে। গত ২৪ অক্টোবর ছিল পরীমনির জন্মদিন। ঢাকার পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজন করেন জমকালো অনুষ্ঠান। বন্ধু, চলচ্চিত্রের সহকর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে উদযাপন করেন বিশেষ দিনটি।
এবারের আয়োজনের থিম ছিল ‘শিউলি সন্ধ্যা’। সিঁড়ি থেকে অনুষ্ঠানস্থল—সবখানেই শিউলি ফুলের সাজ। শিউলি ফুলের নকশা করা শাড়িতে হাজির হন পরীমনি। এমনকি চট্টগ্রাম থেকে উড়োজাহাজে করেও এক ভক্ত পাঠান শিউলি ফুল। অনুষ্ঠানে নতুন সিনেমা ‘ফারজানা’র ঘোষণাও দেন তিনি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি, আড্ডা আর আনন্দের মুহূর্ত—সবই ছিল সেই আয়োজনে। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই সম্পর্কের সমীকরণই যেন পাল্টে যায়।
এক হাতেই ক্যামেরা সামলান রবিউল, তাকেই গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ!
গত ৪ নভেম্বর নাসির উদ্দিনের করা মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় পরীমনির জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরদিন ৫ নভেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন তিনি। ৫০০ টাকার মুচলেকায় জামিনও পান। কিন্তু আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ই শুরু হয় নতুন বিতর্ক।
সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজু ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় পরীমনি অভিযোগ করেন, ওই সাংবাদিক তার শরীরে হাত দিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগের মুখে পড়া রবিউলের দাবি, তিনি শুধু ভিডিও ধারণ করছিলেন। অথচ তাকেই লক্ষ্য করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও গালিগালাজ করেন পরীমনি। লিফটে ওঠার সময় তার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তিনি সেটি ফিরিয়ে নেন। ট্রাইপড ভাঙচুরের অভিযোগও করেন তিনি।
ঘটনাস্থলের ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ঘিরে তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। পরীমনির অভিযোগের বিপরীতে রবিউলের শারীরিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এনে প্রতিবাদ জানান তার সহকর্মীরাও।
এদিকে পরীমনির ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের ধাক্কাধাক্কিতে আহত হন জাগো নিউজের দুই সংবাদকর্মী আশিকুজ্জামান ও আব্দুল্লাহ আল কাউছার। আহত হন আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেনও বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ঘটনায় সুজন চন্দ্র মনি দাস নামে এক বিচারপ্রার্থীর মাথায় আঘাত লাগে। আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর রবিউল হোসাইন রাজু নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে পরীমনির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার সহকর্মীরাও প্রতিবাদ জানান। রাজু জানিয়েছেন, পরীমনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি তিনি ভাবছেন এবং তার কর্মস্থলের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
একসময় যাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে জন্মদিনের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন, তাদের সঙ্গেই কেন এমন সংঘাত বোট ক্লাবের ঘটনায় সাংবাদিকদের সামনে এসে বিচার চাওয়া পরীমনি এবার নিজেই সাংবাদিকদের অভিযোগের মুখে।
একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরও রয়েছে নিরাপদে দায়িত্ব পালনের অধিকার।
পরীমনিকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। কিন্তু সর্বশেষ আদালত প্রাঙ্গণের ঘটনা আবারও সামনে এনেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—তারকাখ্যাতির বাইরে পেশাগত দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে
অভিযোগ নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণই নির্ধারণ করুক প্রকৃত ঘটনা।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
