জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি—দেশটি চলবে কোন নিয়মে? রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, নাগরিকের অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে, সরকার ও বিচারব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয় সংবিধান। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই সংবিধান গ্রহণের দিনটি ৪ নভেম্বর। তাই দিনটি পালিত হয় জাতীয় সংবিধান দিবস হিসেবে।
১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, কাঠামো এবং নাগরিকের অধিকার নির্ধারণ করে একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করা।
খসড়া সংবিধান ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়। ১৯ অক্টোবর শুরু হয় প্রথম পাঠ, যা চলে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। এরপর ৩১ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলে দ্বিতীয় পাঠ। আলোচনা ও পর্যালোচনার পর ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান বিলের তৃতীয় পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন ৬৫টি সংশোধনী অনুমোদনের পর গণপরিষদ বাংলাদেশের সংবিধান গ্রহণ ও প্রণয়ন করে।
সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এর প্রস্তাবনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মানুষের আত্মত্যাগ এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যও সেখানে ঘোষণা করা হয়েছে।
সংবিধান গ্রহণের দিন ৪ নভেম্বর হলেও এটি কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসে। সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদে কার্যকারিতার এই তারিখ উল্লেখ আছে। মূল সংবিধান ইংরেজিতে লেখা হলেও একই সময়ে বাংলা অনুবাদ করা হয়। বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো অসংগতি দেখা দিলে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে—এ কথাও সংবিধানে স্পষ্ট করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ৪ নভেম্বরকে জাতীয় সংবিধান দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০২২ সালে। ওই বছর থেকেই দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন শুরু হয়। দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল গ্রহণের স্মরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভিত্তি, নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে জানারও উপলক্ষ।
সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা সংবিধানের অধীনেই প্রয়োগ করতে হয়। তাই সংবিধান সম্পর্কে জানা, এর মর্যাদা রক্ষা করা এবং এর স্বীকৃত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রত্যেক নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় সংবিধান দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার চেতনা কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে সংবিধানের চর্চা এবং সুরক্ষা জরুরি। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাই দিবসটির অন্যতম তাৎপর্য, আজও।
বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতার মাত্র ১১ মাসের মধ্যে! ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে গঠন করা হয় ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান। এতে নির্ধারণ করা হয় চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। তবে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল ৪ নভেম্বর হলেও কার্যকর হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে। এই ঐতিহাসিক দিনটিই এখন পালিত হয় জাতীয় সংবিধান দিবস হিসেবে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
