ইরান কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে

সানজিদা বারী: ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ শুরু হয়েছে এই বছরের শুরুতে। অনেক বার যুদ্ধ বন্ধ করার আলোচনা চলেছে কিন্তু প্রায় কোনো আলোচনাই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য কোন ফলপ্রসূ ফলাফল নিয়ে আসতে পারেনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা অনেকটাই টালমাটাল। ইসরায়েলে মাত্রই শেষ হলো জাতীয় নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রে চলছে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প ধারণা করা হচ্ছে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকার হবে। অনেকেই মনে করছেন, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এই ত্রিমুখী যুদ্ধের গতি প্রকৃতি বদলে দিতে পারে। বর্তমানে উভয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের পর নতুন নেতৃত্ব কীভাবে এই যুদ্ধ এগিয়ে নিবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায় আর এছাড়াও নির্বাচনের পর দেশ দুটির ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটা নিয়েও অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে চলছে মধ্যবর্তী নির্বাচন যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল শক্ত অবস্থানে নেই এবং এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে ট্রাম্প সরকারের বৈদেশিক নীতি কোন দিকে যাবে এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ কোন দিকে এগোবে। অনেকেই মনে করছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে কারণ কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ধরে রাখতে রিপাবলিকানরা কঠিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছে আর ইরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি তাদের ভোট বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। মার্কিন নাগরিকদের জন্য পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলেছে। 

ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলে তা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য লাভজনক হবে। আর এই বিষয়টিকেই যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সম্ভাব্য আলোচনায় নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে তেহরান। দর-কষাকষির শর্ত হিসেবে ইরান বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, সব যুদ্ধক্ষেত্রে সংঘাত বন্ধ করা— যার মধ্যে লেবাননের যুদ্ধও অন্তর্ভুক্ত। লেবাননে ইসরায়েল ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। শর্তগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে বিদেশে জব্দ বা অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকার করা। গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নতুন করে ব্যাপকভিত্তিক শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে ইরানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে একটি চিঠি পাঠান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তা এবং একজন ইরানি কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন। ভ্যান্স চিঠিটি ইরানের নির্বাচিত সরকার কিংবা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে না পাঠিয়ে সরাসরি পাঠিয়েছেন দেশটির শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ির কাছে। রেজায়ি দীর্ঘদিন ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের প্রধান কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শুরু হয়েছে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। সম্ভাব্য হামলা মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হতে পারে। 

অন্যদিকে ইসরায়েলেও চলছে জাতীয় নির্বাচন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই করছেন। ইসরায়েলে চলতি সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি জোট কিংবা দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট— কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ভোট পায়নি। ইসরায়েলের ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে (নেসেট) সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ৬১টি আসন প্রয়োজন কিন্তু প্রধান দুটি জোটের কোনোটিই সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নিশ্চিতভাবেই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার গঠন করা সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না, কারণ ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন রয়েছে। এই বিভাজনের কারণে আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হওয়া কোনো জোট গঠনও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবুও সরকার গঠন করা একেবারে অসম্ভব নয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এমন একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর জোট সরকার গঠিত হতে পারে, যা ক্ষমতায় মাত্র এক বছর কিংবা তার কিছু বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সরকার গঠনের জন্য ১২ সপ্তাহ সময় পাবেন। এই সময়ের মধ্যে তারা যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তাহলে ইসরায়েলের জনগণকে আবারও ভোট দিতে যেতে হবে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো পক্ষের সুস্পষ্ট বিজয় নিশ্চিত না হওয়ায় ইসরায়েল আগামী কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে পারে এমনটাই ভাবা হচ্ছে। এই সম্ভাবনাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলতে থাকলেও ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে আসন পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন। দলীয় নেতাদের মতামত জানার পর তিনি তাদের মধ্য থেকে একজনকে সরকার গঠনের চেষ্টা করার দায়িত্ব দেবেন। ধারণা করা হচ্ছে, আরব রাজনৈতিক দলগুলো গাদি আইজেনকটের প্রতি সমর্থন জানাবে। ফলে মধ্যপন্থি ইয়াশার পার্টির এই নেতাই প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন।

তবে ইসরায়েলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলেই যে ইরানের উপর যুদ্ধ করা বন্ধ হবে এমন কোন কথা নেই। যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক না কেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই যাক না কেন, সহসা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ হচ্ছে না কারণ ইরান শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন যেসব ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, সেগুলো মেনে নেওয়ার ব্যাপরে আগ্রহী নয় আর শক্ত এবং গ্রহণযোগ্য শান্তিচুক্তি ছাড়া যুদ্ধ থেমে যাবে এমনটা ভাবাও বোকামি। তবে মনে হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সম্ভবত স্বল্পমেয়াদি হবে। এর ফলে ইরানের প্রতি ইসরায়েলের নীতিতে কোনো মৌলিক বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। কারণ ১৯৮০-এর দশক থেকে ইসরায়েলে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ইরান ও ইসরায়েলের একে অপরের প্রতি নীতিগত অবস্থান মূলত অপরিবর্তিত রয়েছে। এমনকি মি. আইজেনকট কিংবা বিরোধী দলের অন্য কোনো নেতা ইসরায়েলের ক্ষমতায় এসে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করলে কিংবা গোপন অভিযান ও কৌশল অবলম্বনের নীতি চালিয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। 

ইরান এই রাজনৈতিক বাস্তবতা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে বলেই মনে হয় আর তাই ইরান নিজের মতো করে যুদ্ধের প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কৌশলগত চিন্তাভাবনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসা কৌশলগত ধৈর্য নীতি থেকে সরে আসছে, ফলে ইসরায়েল সরাসরি সামরিক হামলার পরিবর্তে পরোক্ষ বা গোপন অভিযান পরিচালনা করলেও ইরান তার জবাবে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে। 

এদিকে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি সশস্ত্র বহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যেকোনো ধরনের বা মাত্রার হুমকির জবাবে তাৎক্ষণিক পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সর্বোচ্চ মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা যায়। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব ধরনের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদ রেজা আজিজি ইরান সরকারের অবস্থান সম্পর্কে বলেন, ‘তারা কয়েক সপ্তাহ ধরেই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছে এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিচ্ছে।’ তেহরানভিত্তিক আরব সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক মোহাম্মদ সালেহ সেদঘিয়ানের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা থেকে সরে গেলে ইরান সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখবে। চলতি বছর ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজি করাতে নেতানিয়াহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে নতুন করে বিমান হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নেরও চেষ্টা করেছিলেন।

এই নির্বাচন, রাজনীতি এবং আক্রমণের আশঙ্কার ডামাডোলে একটি প্রশ্ন বারবার চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই তিন দেশের মধ্যে কি শান্তিচুক্তি হবে না? এই তিন দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি হওয়ার জন্য কয়েকটা ব্যাপার খুব গুরুত্বপূর্ণ যেমন: হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তদারকি এবং ইরানের পারমাণবিক প্রতিশ্রুতির পরিধিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে এসব দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরেছে। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে এই শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। তারপর আলোচনা মূল পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত নেই কারণ ট্রাম্প প্রশাসন আগেই বলেছে হরমুজ প্রণালির মূল নিয়ন্ত্রণ তারা ইরানের হাতে ছেড়ে দিতে নারাজ। 

বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে এবং কিছু ছাড় দিতেও রাজি হয়, তবুও দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের এই জটিল জাল থেকে কোনো অর্থবহ সমাধান বেরিয়ে আসা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এক্ষেত্রে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল খুব একটা প্রভাব ফেলবে না এবং ইরানের নেতারাও তাই মনে করছেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যদি ডেমোক্র্যাটরা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ইসরায়েলে গাদি আইজেনকট নেসেটে নিয়ন্ত্রণ নিলেও না। 

ডক্টরাল ফেলো, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগো