নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে দরপতনের পেছনে এখন শুধু দুর্বল কোম্পানির শেয়ার বিক্রি নয়, বরং ভালো-মন্দ নির্বিশেষে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতাও বড় হয়ে উঠেছে। চলমান করপোরেট আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের মৌসুমেও বাজারে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। বরং বড় কোম্পানির শেয়ারেও বিক্রির চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণে বাজারের ভারসাম্য অনেকটাই খুচরা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক নেমে এসেছে গত পাঁচ মাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে।
বাজারের এ দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও শেয়ারদরের আচরণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা। চলতি হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয় বেড়েছে। আইপিডিসি ফাইন্যান্সের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ৮২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬১ পয়সা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন নগদ প্রবাহও বেড়েছে। পাশাপাশি ৪০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এমন করপোরেট ঘোষণা সত্ত্বেও সামগ্রিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোম্পানির ইতিবাচক আর্থিক তথ্য এখনও বাজারের সামগ্রিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারছে না।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা। ডিএসইর সোমবারের লেনদেনের গ্রাহকভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মোট লেনদেনের ৯১ দশমিক ৫৬ শতাংশই ছিল ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ। বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও ছিল সীমিত, মোট লেনদেনের মাত্র ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে বাজারে বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের উপস্থিতি দুর্বল থাকছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকায় দর সংশোধনের সময় বাজারে ক্রেতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
বাজারের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বিক্রির চাপ এখন আর নির্দিষ্ট কয়েকটি দুর্বল কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। সোমবার সূচক পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইসলামী ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) ও পূবালী ব্যাংকের মতো বড় মূলধনি প্রতিষ্ঠান। ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে সূচক থেকে ৭ পয়েন্ট এবং বিএটিবিসির ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ দরপতনে আরও ৬ দশমিক ১ পয়েন্ট কমেছে। অর্থাৎ বাজারের বড় মূলধনি শেয়ারগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের বিক্রির প্রবণতা রয়েছে। এতে সূচকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে।
তবে পুরো বাজারে বিক্রির চাপ থাকলেও বস্ত্র খাতের কিছু কোম্পানিতে ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে। এদিন মতিন স্পিনিংয়ের শেয়ারদর ৬ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ৯৭ টাকা ২০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কোম্পানিটির ১৪ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। বস্ত্র খাতের লেনদেনের অংশও ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি সরে না গেলেও তারা নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে সীমিতভাবে অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
অন্যদিকে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ লেনদেন হলেও খাতটির সার্বিক দরপতন হয়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশেষ করে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যাংক খাতেও লেনদেনের অংশ কমে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। ফলে বাজারের প্রচলিত বিনিয়োগ গন্তব্যগুলোতেও আগ্রহের ঘাটতি স্পষ্ট হচ্ছে।
সোমবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫১ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে নেমেছে। লেনদেন হওয়া ৩৯৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর কমেছে ২৪৬টির, বেড়েছে ৮৫টির। মূল বাজারে লেনদেনও আগের দিনের তুলনায় ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ৪০৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ব্লক মার্কেটেও বড় অঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের উপস্থিতি সীমিত ছিল। সেখানে মোট ৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সূচকের পতনের চিত্র নয়; বরং নতুন বিনিয়োগের অনাগ্রহ, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ঘাটতি এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
