ঘুমের ঘাটতির শারীরিক ক্ষতি কমাতে সংক্ষিপ্ত ‘এইচআইআইটি’

অনলাইন ডেস্ক: ব্যস্ত জীবনযাত্রা কিংবা অনিয়মের কারণে রাতের প্রয়োজনীয় ঘুম হাতছাড়া হওয়া আধুনিক জীবনের একটি অন্যতম সাধারণ সমস্যা, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্লিপ ডেট’ বা ‘ঘুমের ঋণ’ বলা হয়। সাধারণ ধারণা রয়েছে যে কাজের দিনগুলোতে কম ঘুমিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমালেই এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব; তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ছুটির দিনের বাড়তি ঘুম শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষতি পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক পোর্টাল ‘সেল্ফ ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার কারণে যদি ঘুমের ঘাটতি কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব না হয়, তবে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটের উচ্চ-তীব্রতার বিশেষ ব্যায়াম ‘হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেইনিং’ বা ‘এইচআইআইটি’ এই ক্ষতি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বোর্ড-প্রত্যয়িত ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যানঞ্জেলা হলিডে-বেলের মতে, শরীরে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হলে রক্তে ‘কর্টিসল’ নামের স্ট্রেস হরমোন এবং অভ্যন্তরীণ প্রদাহ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা রক্তনালী ও হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া মার্কিন নিউরো-ফিজিওলজিস্ট লুইসা নিকোলা ব্যাখ্যা করেছেন, মাত্র এক বা দুই রাত কম ঘুমালেই শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে। আরও বিপজ্জনক দিক হলো, ইনসুলিনের এই ঘাটতি মস্তিষ্কের গ্লুকোজ থেকে শক্তি তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, যার ফলে ভবিষ্যতে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারস রোগের মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতির সময়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের দ্রুতগতির এইচআইআইটি সেশন মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ার ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম। সংক্ষিপ্ত এই ব্যায়াম ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। পাশাপাশি এই কসরতের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোষে গ্লুকোজ ও অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং ‘বিডিএনএফ’ নামক বিশেষ একটি রাসায়নিকের নিঃসরণ বাড়ে। এই রাসায়নিকটি কম ঘুমের কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া ঠেকায় এবং আলঝেইমারসের মতো অকাল আক্রমণ থেকে মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

তবে শরীর যখন চরম মাত্রার অনিদ্রা বা ক্লান্তিতে অসাড় হয়ে থাকে, তখন ব্যায়ামের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের মুখপাত্র অধ্যাপক জেনিফার মার্টিন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত ক্লান্ত অবস্থায় জোরপূর্বক ভারী কসরত করতে গেলে পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি থাকে; তাই সামান্য বিশ্রামের পর শরীর যখন কিছুটা সচল বোধ হবে, তখন মাত্র ১০ মিনিটের জন্য স্প্রিন্ট, দ্রুত সাইকেল চালানো কিংবা জাম্পিং জ্যাকের মতো তীব্র ব্যায়াম করা নিরাপদ। সবশেষে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে মনে করিয়ে দেন যে কোনো ব্যায়ামই দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নয়; তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টার নিয়মিত ঘুম এবং ছুটির দিনেও স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখা দীর্ঘায়ুর জন্য অপরিহার্য।
জেএ/অভি