ব্রিটেন কেন ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি চিঠি লিখেছিলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আর সেই চিঠি পাঠানো হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যাংকার পরিবারের সদস্য লর্ড রথচাইল্ডকে। প্রশ্ন হলো, কেন তাকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল? রথচাইল্ড পরিবারের অর্থ কি ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছিল? নাকি এর পেছনে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আরও বড় কোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ? ইতিহাসের সেই অজানা অধ্যায় নিয়েই আজকের আলোচনা।

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস ব্যালফোর একটি চিঠি পাঠালেন লর্ড রথচাইল্ডের কাছে। চিঠিতে বলা হলো, ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় ব্রিটিশ সরকার সমর্থন দেবে। ইতিহাসে এই ঘোষণা ব্যালফোর ডিক্লারেশন নামে পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ব্রিটেন কেন চিঠিটি লিখেছিল এমন একজন ব্যাংকারকে, আর এর পেছনে রথচাইল্ড পরিবারের স্বার্থই বা কী ছিল?

 

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। চিঠির প্রাপক ছিলেন লিওনেল ওয়াল্টার রথচাইল্ড, দ্বিতীয় ব্যারন রথচাইল্ড। তিনি ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং জায়নবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যালফোর তাকে চিঠিটি দিয়েছিলেন, যাতে তিনি তা জায়নিস্ট ফেডারেশনের কাছে পৌঁছে দেন। অর্থাৎ তাকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল তার সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক যোগাযোগ; তিনি শুধু ধনী ব্যাংকার ছিলেন বলে নয়।

তাহলে রথচাইল্ড পরিবারের অর্থনৈতিক ভূমিকা কী? পরিবারের আরেক সদস্য ব্যারন এডমন্ড ডি রথচাইল্ড উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই ফিলিস্তিনে ইহুদি কৃষি বসতি গড়তে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা দেন। জমি কেনা, কৃষি প্রকল্প ও বসতি টিকিয়ে রাখতে তার অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে ওয়াল্টার ও এডমন্ড এক ব্যক্তি নন। আর ব্যালফোর ডিক্লারেশন আদায়ের বিনিময়ে রথচাইল্ড পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে অর্থ দিয়েছিল, এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

ঘোষণার পেছনে ব্রিটেনের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাবও ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে। ফিলিস্তিন ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ; সুয়েজ খাল ও ভারতের পথে ব্রিটিশ যোগাযোগ রক্ষার স্বার্থ ছিল সেখানে। ব্রিটিশ নেতাদের একাংশ আশা করেছিলেন, জায়নবাদীদের সমর্থন পেলে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক জনমত মিত্রশক্তির পক্ষে প্রভাবিত হবে। আবার ব্যালফোর ও প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জের মতো নেতার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল।

ঘোষণায় ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমির কথা বলা হলেও, ফিলিস্তিনের সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব জনগণের জাতীয় ও রাজনৈতিক অধিকার স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়নি। শুধু তাদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন না করার কথা বলা হয়েছিল। এই অসম প্রতিশ্রুতি পরবর্তী সংঘাতের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তাই ব্যালফোর ডিক্লারেশনকে শুধু কোনো ধনী পরিবারের অর্থের ফল বলা ইতিহাসকে সরল করে দেখা। এটি ছিল জায়নবাদী কূটনীতি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক স্বার্থ, যুদ্ধকালীন হিসাব এবং ইউরোপীয় রাজনীতির মিলিত সিদ্ধান্ত।

১৯২২ সালে লীগ অব নেশনসের ম্যান্ডেটে ঘোষণার নীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ব্রিটেন ফিলিস্তিনের প্রশাসনিক দায়িত্ব পায়। পরবর্তী দশকগুলোতে ইহুদি অভিবাসন ও আরব জনগোষ্ঠীর বিরোধ বাড়ে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি ঘটে। তাই চিঠিটির গুরুত্ব শুধু ১৯১৭ সালের কূটনৈতিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসে গভীরভাবে রয়ে গেছে। এই ইতিহাস বুঝতে দলিল ও প্রেক্ষাপট দুটোই খুব জরুরি।

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোর একটি ঐতিহাসিক চিঠি পাঠান লর্ড রথচাইল্ডের কাছে। সেখানে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় ব্রিটিশ সমর্থনের কথা জানানো হয়। কিন্তু কেন রথচাইল্ডকে লেখা হয়েছিল এই চিঠি? তিনি ছিলেন ব্রিটেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা। অন্যদিকে, তার পরিবারের সদস্য এডমন্ড রথচাইল্ড ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনে বিপুল অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। তবে এর পেছনে ছিল ব্রিটেনের সাম্রাজ্যিক ও যুদ্ধকালীন স্বার্থও। এই ঘোষণাই পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনের ইতিহাস বদলে দেওয়ার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি