১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, খাদ্যসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে শুরু করে দেশের অর্থনৈতিক নীতিও। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর অর্থনীতির সামনে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

স্বাধীনতার পর দেশের সড়ক, সেতু, রেলপথ, কলকারখানা ও বন্দরব্যবস্থার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। উৎপাদন কমে যায়, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়। পাকিস্তান আমলের বাজার ও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খাদ্য, জ্বালানি, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেয়। শিল্পকারখানার অনেক মালিক দেশ ছেড়ে যাওয়ায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় রাষ্ট্র। ফলে অর্থনীতিতে সরকারি খাতের প্রভাব বেড়ে যায়।

 

এর মধ্যে আন্তর্জাতিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭২-৭৪ সময়ে মূল্যস্ফীতি গড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, খরা ও বন্যা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৮০ শতাংশে উঠেছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে আসে, খাদ্য ও সারের ঘাটতি তীব্র হয়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, আর কালোবাজারি ও চোরাচালানের মতো সমস্যা ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক নীতিতেও বড় মোড় আসে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে মিশ্র অর্থনীতির দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে নতুন শিল্প বিনিয়োগ নীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। কিছু শিল্পে বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়, নতুন করে জাতীয়করণ না করার নীতি নেওয়া হয় এবং পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানায় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগও চলতে থাকে।

তবে নীতি বদলালেই সংকট কেটে যায়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অবকাঠামো, খাদ্য উৎপাদনে আবহাওয়ার প্রভাব, আমদানিনির্ভরতা এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিকে চাপে রাখে। তবু ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সময়ে ভালো ফসলের বছর এবং স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু লক্ষণ দেখায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ওই সময় গড় প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি ছিল।

উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ তখন বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করত। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, সেচব্যবস্থা উন্নত করা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো পুনর্গঠন ছিল জরুরি কাজ। একই সঙ্গে রপ্তানির প্রধান পণ্য পাটের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ফলে বৈদেশিক আয় বাড়ানোও সহজ ছিল না।

এই পরিবর্তনের সুফল পেতে অনেক সময়, বিনিয়োগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা দরকার ছিল। অর্থাৎ, ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশ একদিকে সংকট সামলেছে, অন্যদিকে অর্থনীতির কাঠামো বদলানোর পথে এগিয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল গভীর সংকটে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, খাদ্যসংকট, মূল্যস্ফীতি আর বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে বিপর্যস্ত ছিল দেশ। ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৮০ শতাংশে পৌঁছায় বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক নীতিতেও আসে বড় পরিবর্তন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। তবে সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি