বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এ খাত থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ লাখ মানুষের। বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাকশিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ যে শ্রমিকের শ্রম ও ঘামে এই শিল্প দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জীবনমান ও মজুরির প্রশ্নটি বারবার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভ সেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয় যে হারে বেড়েছে, তাতে প্রচলিত মজুরি দিয়ে একজন শ্রমিকের পক্ষে পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করা কঠিন। একজন শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের সময় শুধু শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কিংবা মালিকের মুনাফার হিসাব বিবেচনায় নিলে চলবে না। শ্রমিকের ন্যূনতম খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, পুষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে এমন মজুরি নিশ্চিত করতে হবে যাতে তিনি শুধু বেঁচে থাকতে নয়, মর্যাদা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারেন।
এ বাস্তবতায় শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই অঙ্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ। মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা ইতিবাচক পদক্ষেপ হবে। তবে বোর্ডের কাজ যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। শ্রমিক, মালিক, সরকার ও অর্থনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। সংবিধান ও শ্রম আইনে স্বীকৃত অধিকার অনুযায়ী সংগঠিত হওয়া, দাবি জানানো এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সুযোগ তাদের রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে প্রতিকার না পেলে রাজপথে নামার পেছনে শ্রমিকদের ক্ষোভ ও হতাশার কারণ অনুধাবন করতে হবে। তবে আন্দোলনের নামে সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সংঘর্ষ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এতে সাধারণ মানুষ, যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়েন। কারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়ে।
একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সংযম ও পেশাদারত্ব বজায় রাখা উচিত। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। সংঘর্ষের পরিবর্তে আলোচনার পথই হওয়া উচিত প্রধান অবলম্বন। কোনো পক্ষের উসকানি বা সহিংসতা থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ এবং শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নাশকতার সুযোগও প্রতিরোধ করতে হবে।
সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো শ্রমিক ও মালিক-উভয় পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ন্যায়সংগত ভারসাম্য তৈরি করা। দ্রুত মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম শুরু করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করতে হবে। পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন নির্ধারণে পাঁচ সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দ্রুত বোর্ডের সভা করে নতুন মজুরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। নতুন এই বোর্ড শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে। শুধু নতুন মজুরি ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, সেটা যথাসময়ে কার্যকর হচ্ছে কি না সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মজুরি পরিশোধ, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে আইনের অনুসরণ এবং কালোতালিকার মতো বৈষম্যমূলক চর্চা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
পোশাকশিল্পের উন্নয়নকে শুধু রপ্তানি ও মুনাফার পরিসংখ্যানে বিচার করলে চলবে না। এই শিল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শ্রমিকের জীবনমান কতটা উন্নত হলো তার ওপরও। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তার অধিকার। আবার শিল্পের স্থিতিশীলতাও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে অপরিহার্য। তাই সংঘাত নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্বশীল সমঝোতা। শ্রমিকের মুখে হাসি এবং শিল্পের চাকা সচল রাখা-দুটিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না ভেবে একই লক্ষ্য হিসেবে দেখতে হবে।
