তাহসিফের রহস্যমৃত্যু, ৫ আগস্টের ভিডিও ঘিরে আলোচনা (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

 

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এরপর কী ঘটেছিল? রাতের কয়েক ঘণ্টা নিয়ে সামনে এসেছে দুটি বক্তব্য। আর তার পরদিনই তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হলো বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ।

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্নের শেষ নেই। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও নিয়ে তাকে ঘিরে যে আলোচনা ছিল, তা নতুন করে সামনে এসেছে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে কার সঙ্গে ছিলেন তাহসিফ? তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তির বক্তব্য কী? আর এত আলোচনার মধ্যেও মৃত্যুর কারণ নিয়ে কী জানা গেছে?

 

বন্ধুর ফোন, তারপর কী?

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাহসিফকে ফোন করেন শাহরিয়ার দ্বীপ নামে এক বন্ধু। তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, ফোন করে তাকে বাসার নিচে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

এখানে শাহরিয়ার দ্বীপের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তার দাবি, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ তার সঙ্গেই ছিলেন। অর্থাৎ, পরিবারের বক্তব্যে বাসা থেকে ডেকে নেওয়ার বিষয়টি এসেছে, আর দ্বীপের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাতের ওই সময়টুকুতে তাদের একসঙ্গে থাকার কথা। কিন্তু এই দুই বক্তব্যের পরের ঘটনাপ্রবাহ কী? রাত ১২টার পর তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন? কীভাবে তিনি উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে পৌঁছালেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ মেলানো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তে পাওয়া তথ্য। শুধু পাশাপাশি দুটি বক্তব্য থেকে ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

নিখোঁজের পরদিন তুরাগ নদে মিলল মরদেহ

২৮ অক্টোবর বুধবার বিকেল সাড়ে চারটা। সরকারি জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর আসে, উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে ভাসছে একটি মরদেহ। খবর পেয়ে, ঘটনাস্থলে যায় টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। পরে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, মৃত ব্যক্তির পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো শার্ট, হাতে ঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া যায় একটি আইফোন। ওই ফোনের সূত্র ধরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়, তিনি সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। এরপর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিশ্চিত করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নদীতে গেলেন, কিংবা মৃত্যুর আগে ঠিক কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু মরদেহ উদ্ধারের তথ্য থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই, মৃত্যুর কারণ কী?

তাহসিফের মৃত্যুর পর আরেকটি তথ্য সামনে আসে। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন ২৯ অক্টোবর গণমাধ্যমকে জানান, মরদেহের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে এই তথ্য দিয়ে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা যায় না।
পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে কিনা, কিংবা অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল কিনা—তা নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের ফল এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য প্রয়োজন।

একই সঙ্গে, নিখোঁজ হওয়ার আগের ও পরের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে দেখা জরুরি। কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, কখন কোথায় ছিলেন এবং সিসিটিভি ফুটেজে কী দেখা যায়—এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সুতরাং, দৃশ্যমান আঘাত না থাকার তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটিকে মৃত্যুর চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না।

আগস্টের ভিডিও, পুরোনো বিতর্ক কেন ফিরে এল?

তাহসিফকে নিয়ে আলোচনার আরেকটি বড় কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সেটির ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের নাম আলোচনায় আসে।

তবে ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, কে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন এবং তাহসিফের ভূমিকা ঠিক কী ছিল—এসব বিষয় এক করে দেখা যাবে না। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এসেছে। তাই তাকে ভিডিওটির নিশ্চিত ধারণকারী হিসেবে উপস্থাপন করার আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

এদিকে, বিমানবাহিনী থেকে তার অবসর নিয়েও আলোচনা ছিল। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, তাহসিফ সুরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছিল। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের সঙ্গে তাদের অবসরের সম্পর্ক নেই বলেও জানায় সংস্থাটি। কিন্তু, পুরোনো বিতর্ক থাকলেই বর্তমান মৃত্যুর সঙ্গে তার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেই সম্পর্ক আছে কি না, তা জানতে আলাদা প্রমাণ ও তদন্তের ফল প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী বললেন?

তাহসিফের মৃত্যু এবং ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের তথ্য পাওয়ার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না তিনি। সব তথ্য জেনে পরে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ, ভিডিও নিয়ে পুরোনো আলোচনার সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে বিষয়ে এখনই সরকারি পর্যায়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কী জানা যায়, আর নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ কতটা উন্মোচিত হয়।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও বাকি

একটি ফোনকল। বাসা থেকে বের হওয়া। রাতের কয়েক ঘণ্টা নিয়ে দুটি বক্তব্য। তারপর নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার। এই ঘটনাপ্রবাহের প্রতিটি ধাপ এখন গুরুত্বপূর্ণ।

এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই অনুমানের ভিত্তিতে দেওয়া উচিত নয়। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য।

কারণ, আলোচিত অতীত কোনো মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে না। আবার প্রশ্ন উঠেছে বলে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব না। সত্য জানতে হলে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতেই।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি