জমির মালিক হয়েও বিপদে পড়তে পারেন - নামজারি নিয়ে নতুন নিয়ম (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নিজের টাকায় জমি কিনেছেন? সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রিও শেষ, পকেটে দলিলে সিল-ছাপ্পড়ও মারা হয়েছে! ভাবছেন জমি তো এবার পুরোটাই আপনার? ভুল ভাবছেন! কাল সকালে উঠে দেখতে পারেন, নিজের কেনা জমিতেই আপনি অবৈধ দখলদার! কারণ ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়মে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে। একটু অসাবধান হলেই হাতছাড়া হতে পারে কোটি টাকার সম্পত্তি!

একটু এক চিলতে ভূমির স্বপ্ন আর সেই জমিতে একটা স্বপ্নের বাড়ি—এই স্বপ্ন দেখেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সেই স্বপ্ন সত্যি করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষকে পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়। জমি কিনতে গিয়ে প্রতারকের খপ্পরে পড়ে জীবনের সব সঞ্চয় হারানোর ঘটনা এখন অহরহই ঘটছে। তাই জমি কেনার আগে এবং কেনার ঠিক পরেই কোন কাজটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা জানা প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক।

 

ভাবছেন জমি রেজিস্ট্রি করা শেষ মানেই কেল্লা ফতে? একদমই নয়। সরকারি রেকর্ডে মালিকের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত না করা পর্যন্ত আপনি পুরোপুরি নিরাপদ নন। এই প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় নামজারি বা মিউটেশন। নামজারি না করলে পরবর্তীতে ওই জমি বিক্রি, অন্যকে দান, এমনকি নিজের নামের ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে গেলেও আপনি আটকে যাবেন চরম আইনি জালে।

কিন্তু থামুন! এতদিন যেভাবে নামজারি করতেন, এখন আর সেই সুযোগ নেই! আপনি যদি ভাবেন আগের মতো একাই গিয়ে নামজারি করে চলে আসবেন, তবে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে যাচ্ছেন! কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নামজারির মূল আইন পুরোটাই বদলে গেছে!

সহজ কথায়, জমি কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার পর সরকারি ভূমি রেকর্ড বা খতিয়ানে আগের মালিকের নাম কেটে নতুন মালিকের নাম লেখানোই হলো নামজারি। বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমি সেবা পোর্টালে ঘরে বসেই অনলাইনে এই আবেদন করা যায়। নির্ধারিত ফি জমা দিলে সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু অবহেলা করে যদি নামজারি না ঝুলিয়ে রাখেন, তবে অন্য যেকোনো ওয়ারিশ বা অবৈধ দখলদার এসে সরাসরি আপনার জমির মালিকানা দাবি করে বসতে পারে!

আর সবচেয়ে ভয়ংকর খবর হলো—২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপন এখন পুরোদমে কার্যকর হয়ে গেছে! আপনি যদি বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের জমি নামজারি করতে চান, তবে নতুন এই নিয়ম না জানলে আপনার আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে!

নতুন নিয়মটা ঠিক কী? এবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিতে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, কোনো একজন ভাই বা বোন অন্যদের না জানিয়ে এককভাবে নিজের নামে নামজারি বাগিয়ে নিতে পারবে না! আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের এনআইডি, তথ্য এবং সঠিক ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হবে। কোনো একজন ওয়ারিশের তথ্য বাদ পড়লেই পুরো আবেদন নামঞ্জুর!

নতুন নিয়মের মূল নীতি হলো—‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’। অর্থাৎ, প্রথম ধাপে সব ওয়ারিশের নামে একটি যৌথ খতিয়ান হবে এবং প্রত্যেকেই তার আইনগত প্রাপ্য অংশ পাবে। পরবর্তীতে আপনারা যদি যার যার জমি আলাদা করতে চান, তবে অবশ্যই নিবন্ধিত আপস বণ্টননামা দলিল করে তারপর আলাদা খতিয়ান করতে হবে।

শুধু তা-ই নয়! আপনার কাছে যদি হালনাগাদ নামজারি বা খতিয়ান না থাকে, তবে বর্তমানে আপনি সেই জমি কারো কাছে বিক্রি করতে পারবেন না, এমনকি সন্তানকে দান বা হেবাও করতে পারবেন না!

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নতুন দলিলে সাইন করার সময় নামজারির খতিয়ান দেখানো এখন বাধ্যতামূলক। অবশ্য আগে থেকেই যদি নামজারি করা থাকে, তবে নতুন করে নামজারি লাগবে না, পুরোনো খতিয়ানে নাম ঠিক থাকলেই চলবে। তবে সতর্ক থাকুন! আপনার পুরোনো রেকর্ডটি ডিজিটাল সিস্টেমে নিবন্ধিত আছে কিনা তা আজই যাচাই করুন। কারণ ডিজিটাল রেকর্ডে নাম না থাকলে ভবিষ্যতে খাজনা দিতে বা জমি হস্তান্তরে চরম বিপদে পড়বেন।

আবেদনের জন্য কী কী লাগবে? রেজিস্ট্রি দলিল, আগের খতিয়ানের কপি, দাগ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ওয়ারিশ সনদ বা মৃত্যু সনদ। এই ওয়ারিশ সনদ নিতে হবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র অথবা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে।

নতুন নিয়মের ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা তিনটি। প্রথমত, চতুর কোনো ওয়ারিশ অন্যদের বঞ্চিত করে পুরো জমি নিজের নামে নিতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, সরকারি রেকর্ড সঠিক থাকবে এবং প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করা সহজ হবে। তৃতীয়ত, জমি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা মামলা-মোকদ্দমা কমে আসবে। বিশেষ করে নারী ওয়ারিশরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। পরিবারের কেউ বিদেশে থাকলে বা যোগাযোগ না থাকলে সবার কাগজপত্র জোগাড় করা বেশ কঠিন। তাছাড়া আলাদা খতিয়ানের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচ হবে। আর ভূমি অফিসগুলোকে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে এই সেবা নিশ্চিত করতে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা না হলে সাধারণ মানুষ না বুঝেই চরম ভোগান্তিতে পড়বে।

বাবার জমি পেয়েছেন? নামজারির এই নিয়ম না জানলে বিপদ

পৈতৃক জমি নামজারি করতে যাচ্ছেন? সাবধান! ২০২৫ সালের নতুন নিয়ম না জানলে এক কদমও এগোতে পারবেন না! এখন থেকে বাবা-মায়ের জমিতে কোনো একজন ওয়ারিশ একা গিয়ে নিজের নামে নামজারি করতে পারবে না। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন নিয়মে আগে সব ভাই-বোনের নামে যৌথ খতিয়ান হতে হবে, তারপর নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলের মাধ্যমে জমি আলাদা করা যাবে। কোনো একজন ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে আবেদন করলেই নামজারি বাতিল! তাই ভাই-বোনদের বঞ্চিত করার দিন শেষ, নিজের অধিকার বুঝে নিন আজই!

এক ওয়ারিশের নামে আর হবে না পুরো জমি, বদলে গেল নিয়ম

জমি কিনেছেন কিন্তু এখনো নামজারি বা মিউটেশন করেননি? চরম বিপদ অপেক্ষা করছে আপনার জন্য! নতুন আইন অনুযায়ী, নামজারি ও ডিজিটাল খতিয়ান ছাড়া আপনি এখন আর জমি বিক্রি বা অন্যকে দানও করতে পারবেন না! সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল করতে গেলেই নামজারির খতিয়ান দেখানো বাধ্যতামূলক। সামান্য অবহেলায় নিজের কেনা জমিতেই হারাবেন নিজের অধিকার। তাই দেরি না করে ডিজিটাল ভূমি সেবা পোর্টাল থেকে ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই সেরে নিন নামজারি!

—জা. অর্থনীতি/এলএটি