সৌদির শ্রমবাজারে ধাক্কা, হুমকির মুখে প্রবাসী আয়

সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ও সৌদির বিমানবন্দরগুলোয় হুতিদের হামলায় বিদেশযাত্রায় তৈরি হয়েছে বাড়তি অনিশ্চয়তা। ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নতুন কর্মী ও কর্মস্থলে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকের চাহিদা সংকোচন ও যাতায়াতের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সামগ্রিক প্রবাসী আয় বেড়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে কাজ নিয়ে গেছেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩৫ জন বাংলাদেশি। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১০ জন। অর্থাৎ কর্মী যাওয়া কমেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৫ জন বা ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ।

একই সময়ে সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন ৫ লাখ ৯০ হাজার ১৮৮ জন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৫ জন। মোট কর্মী যাওয়া কমেছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৭ জন। এই নিট হ্রাসের প্রায় ৯৫ শতাংশই হয়েছে সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া কমার কারণে।

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার কাতার ও কুয়েতেও কর্মী যাওয়া কমেছে। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত কাতারে গেছেন ৫২ হাজার ৬০ জন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৮৬ হাজার ১৭১ জন। কমেছে ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ। কুয়েতে গেছেন ২৫ হাজার ৩৫ জন, আগের বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৯২৮ জন। কমেছে ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। দুই দেশ মিলিয়ে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

যুদ্ধের প্রভাব বিমান চলাচলে
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধের বিস্তৃত সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইয়েমেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী গত জুলাইয়ে হুতি নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে হামলা চালানোর পর সংঘাত তীব্র হয়। এরপর সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়ায় হুতিরা। উত্তেজনা প্রশমনে ২৬ অক্টোবর তেহরানে আলোচনায় অংশ নেয় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

রয়টার্স জানিয়েছে, অক্টোবরে সৌদির বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল স্থাপনায় হুতিদের হামলায় বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সিরিয়ামের হিসাবে, ৮ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটির বিমানবন্দরগুলো থেকে নির্ধারিত উড্ডয়নের ৪৫ শতাংশ বা ৭ হাজার ৮০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ১০ অক্টোবর থেকে বন্ধ থাকা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২৫ অক্টোবর আংশিক খুললেও নিরাপত্তা উদ্বেগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা নভেম্বর পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে। 

এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের যাত্রী পরিবহনেও। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সৌদিগামী কয়েকটি রুটে চলাচলে বিঘ্নের কারণে গত রোববার বিকাল পর্যন্ত ১৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ২২ হাজার ২৩১ জন যাত্রীর যাত্রা ব্যাহত হয়েছে। তাদের মধ্যে নতুন কর্মী ও ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীরাও রয়েছেন।

অভিবাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মীদের ভিসার মেয়াদ ও কাজে যোগ দেওয়ার সময়সীমা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রক্ষাও কঠিন হতে পারে। বিকল্প ফ্লাইটে যেতে হলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে।

ট্রাভেল ও টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়ও চাপ পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, যাত্রীরা নতুন তারিখের টিকিট খুঁজছেন, বিকল্প বিমানবন্দর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কিংবা যাত্রা পিছিয়ে দিচ্ছেন। এতে পুরোনো টিকিটের অর্থ ফেরত ও যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের চাপ বেড়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সাবেক সভাপতি ও এয়ার স্ট্রিটের কর্ণধার আব্দুস সালাম আরেফ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিকের সৌদিগামী ফ্লাইট থাকে। ওমরাহ যাত্রীসহ কখনও এই সংখ্যা ১ লাখও ছাড়িয়ে যায়। তার দাবি, সাম্প্রতিক সংকটে টিকিট বিক্রি ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে এবং এজেন্সিগুলো লোকসানে পড়ছে।

তবে জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মী যাওয়া কমার পুরোটা সাম্প্রতিক হামলা ও ফ্লাইট বিঘ্নের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এই হিসাবের বড় অংশই অক্টোবরের হামলাগুলোর আগের সময়ের।

প্রবাসী আয় বাড়লেও উদ্বেগ কাটছে না
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৮৫৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। তিন মাসে বেড়েছে ১০০ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে প্রবাসী আয় কমেছে। আগস্টে এসেছিল ২৯৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এক মাসের ব্যবধানে কমেছে ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার। যদিও গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এবারের সেপ্টেম্বরে আয় বেড়েছে। ফলে এক মাসের তুলনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৫৮৪ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে এসেছিল প্রায় ৪২৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। এক অর্থবছরে বেড়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কর্মী যাওয়া কমলেই সঙ্গে সঙ্গে প্রবাসী আয় কমবে, এমন নয়। বিদেশে আগে থেকে কর্মরত বাংলাদেশিরা নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিন নতুন কর্মসংস্থান কম থাকলে ভবিষ্যতে আয় বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। সংকটের প্রভাব বুঝতে সৌদি আরব থেকে আসা প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি নতুন নিয়োগ, কর্মরত বাংলাদেশিদের চাকরির অবস্থা ও ফ্লাইট চলাচল পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বিকল্প বাজার ও দক্ষতায় জোর
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সৌদি আরবে ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি এবং কিছু নতুন প্রকল্প স্থগিত থাকায় শ্রমিকের চাহিদায় সংকোচন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব যুক্ত হলে কর্মী পাঠানোর গতি আরও কমতে পারে। সেই প্রভাব পরবর্তী সময়ের হিসাবে বোঝা যাবে।

তার মতে, প্রবাসী আয় শুধু নতুন কতজন কর্মী যাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে না; বিদেশে আগে থেকে কতজন কর্মরত আছেন, সেটিও বড় বিবেচ্য। সৌদি আরবে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। নতুন কর্মী যোগ হলে আয় আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। কর্মী যাওয়া কমলে সেই সম্ভাব্য বাড়তি আয় সীমিত হতে পারে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়া ও পূর্ব ইউরোপসহ অন্য শ্রমবাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ কর্মী পাঠানোয় জোর দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান যাতে হঠাৎ বড় সংকটে না পড়ে সে জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।