সম্ভাবনার রংপুর, বিনিয়োগের অপেক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা

শেখ মাজেদুল হক: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ জনপদ রংপুরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজে লাগানো যায়নি। কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, পর্যটন, সীমান্তবাণিজ্য এবং সেবা খাত— প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ। প্রয়োজন শুধু সম্ভাবনা চিহ্নিত করা নয়, সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদন, আয় ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ।

প্রশ্ন হলো, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রংপুরে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন কেন প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না? কেন কৃষিপ্রধান অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য মূল্য সংযোজন স্থানীয়ভাবে সীমিত? কেন অনেক তরুণকে কাজের সন্ধানে নিজের অঞ্চল ছেড়ে যেতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগনির্ভর আশাবাদের পরিবর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের কার্যকর সমন্বয়।


কৃষি থেকে শিল্পায়ন: সম্পদ আছে, প্রয়োজন মূল্য সংযোজন। রংপুরের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি কৃষি। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও রয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কিন্তু শুধু উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের কার্যকরব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক হিমাগার, ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমায়িত খাদ্য, ভুট্টাভিত্তিক পশুখাদ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, প্যাকেটজাত খাদ্য এবং কৃষিপণ্যের মান পরীক্ষার মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে এসব শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের বাজার নিশ্চিত হবে, পণ্যের অপচয় কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে কৃষিযন্ত্র, উন্নত সেচপ্রযুক্তি, বীজ উৎপাদন ও কৃষিভিত্তিক সেবায় নতুন উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি, মানসম্মত উৎপাদন এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কৃষি ও শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে পারলে রংপুর কেবল কৃষিপণ্য উৎপাদনের অঞ্চল নয়, বরং কৃষিভিত্তিক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।


ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ: কর্মসংস্থানের শক্তিশালী ভিত্তি। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ; তবে আঞ্চলিক অর্থনীতির বিস্তৃত বিকাশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ভূমিকা অনস্বীকার্য। খাদ্য উৎপাদন, পোশাক, আসবাব, কৃষিযন্ত্র, প্যাকেজিং, পরিবহন, মেরামত ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। অথচ পুঁজির অভাব, ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং বাজারসংযোগের দুর্বলতা অনেক উদ্যোগের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। তাই শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, ডিজিটাল বিপণন ও বাজার গবেষণায় সহায়তা দিতে হবে। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষিত তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বাণিজ্য সংগঠন যৌথভাবে কাজ করতে পারে।


অবকাঠামো ও সীমান্তবাণিজ্য: বিনিয়োগের আস্থার প্রশ্ন। বিনিয়োগকারীরা শুধু জমির দাম বা শ্রমিকের মজুরি বিবেচনা করেন না; তারা দেখেন উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহনের সময়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং প্রশাসনিক সেবার কার্যকারিতা। তাই রংপুরের উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে মহাসড়ক, রেলপথ, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, আধুনিক গুদাম এবং শীতল সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ভারতীয় সীমান্তের নৈকট্য রংপুর বিভাগের জন্য আরেকটি সম্ভাবনাময় সম্পদ। বৈধ সীমান্তবাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে এ অবস্থান কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে ভৌগোলিক নৈকট্য নিজে থেকেই অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করে না। প্রয়োজন সহজ শুল্কপ্রক্রিয়া, মান পরীক্ষার সুবিধা, উন্নত যোগাযোগ এবং স্থিতিশীল বাণিজ্যনীতি। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানি নয়, বরং স্থানীয় উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো।


পর্যটন ও সেবা খাত: তাজহাট জমিদারবাড়ি, বেগম রোকেয়ার স্মৃতিবিজড়িত স্থান এবং বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক আকর্ষণকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। তবে পর্যটন বিকাশের জন্য শুধু প্রচারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন খাবার, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং সহজে পাওয়া যায় এমন তথ্য ও বুকিংসেবা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন, বিপণন ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার বিকাশ রংপুর শহরকে আশপাশের জেলাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন আয় সৃষ্টি হবে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে।

বিনিয়োগের বাধা দূর করতে চাই বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, সম্ভাবনা আর বাস্তব বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। জমি, অবকাঠামো, অর্থায়ন, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও বাজারসংযোগের সীমাবদ্ধতা দূর না হলে বিনিয়োগের আহ্বান প্রত্যাশিত ফল দেবে না। তাই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অর্থনৈতিক শুমারিসহ নির্ভরযোগ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে জেলার ভিত্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলার অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পৃথক খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোথাও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোথাও পর্যটন, কোথাও গুদাম ও পরিবহনসেবা, আবার কোথাও ক্ষুদ্র প্রকৌশলশিল্প লাভজনক হতে পারে। এসব সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বাজারের চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় ও সম্ভাব্য মুনাফার বাস্তব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।

একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত সেবাব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা পেতে অযথা একাধিক দপ্তরে ঘুরতে না হয়। স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্থানীয় উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার করতে হবে। বাজার গবেষণা, উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ, ভোক্তার আচরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের পরিমাণের মতো সূচক নিয়মিত প্রকাশ করে অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে।

রংপুরের অগ্রগতি মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি। আঞ্চলিক বিনিয়োগের সুফল শুধু একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন বাড়লে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বড় শহরগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলো অবহেলিত থাকলে স্থানীয় সম্পদ, শ্রম ও মেধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না।

রংপুরের উন্নয়নের লক্ষ্য তাই শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়; বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কৃষকের ন্যায্য আয়, উদ্যোক্তার বিকাশ, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, দক্ষ প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা।

রংপুরের সামনে প্রশ্ন এখন সম্ভাবনা আছে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ কতটা রয়েছে। শুধু প্রতিশ্রুতি বা বিনিয়োগের আহ্বানে নয়, অবকাঠামো, অর্থায়ন, দক্ষতা ও বাজারসংযোগের বাস্তব উন্নয়নের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানো গেলে রংপুর শুধু উত্তরাঞ্চলের নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।