এক মাস পরও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা  চালু হয়নি রাড্ডায়

মো. মতিউর রহমান ঢাকা: মিরপুর শাহ আলী মাজারসংলগ্ন ছিন্নমূল শপিং কমপ্লেক্সের পেছনে অবস্থিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার এক মাস পরও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালু আছে। কিন্তু বন্ধ রয়েছে আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা। ফলে গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বাড়তি খরচে অন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে নারীদের।

জানা গেছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর  রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরা ২০০ থেকে ২৫০ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে প্রবেশ করে। দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায় তারা। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করা হয়। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এ ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার ২৫ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় মিরপুরের বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ছাড়া আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। পরে ৪ অক্টোবর মামলাটি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভাঙচুরে ক্ষতি ৪৯ লাখ, লুটের অভিযোগ ৬০ লাখ টাকার
এজাহারে বলা হয়েছে, হামলা ও ভাঙচুরে প্রতিষ্ঠানটির মোট এক কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কক্ষ, ভবন, প্রধান ফটক, জানালা-দরজা ও স্থাপনা ভাঙচুরে ক্ষতির পরিমাণ ৪৯ লাখ টাকা। আর চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, আসবাব ও অন্যান্য মালামাল লুট হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকার।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, হাতুড়ি দিয়ে প্রধান ফটক ভাঙা এবং প্রায় ২৮ ফুট লম্বা ও ১৫ ফুট চওড়া একটি ঘর ভেকু দিয়ে ভাঙায় আনুমানিক তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার কাজে ব্যবহৃত আরেকটি আধাপাকা ঘর ও এর ভেতরের আসবাব ভাঙচুরে ক্ষতি হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।

ক্লিনিক ইনচার্জ, চিকিৎসক ও ডেপুটি ক্লিনিক ইনচার্জের কক্ষের আসবাব ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রায় ১০০ ফুট লম্বা ও ৪০ ফুট চওড়া নিবন্ধন শাখা ভাঙচুরে আরও ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ, টিকাকেন্দ্র ও পরীক্ষাগারের পাকা ভবনের জানালা-দরজা ভাঙচুরে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে দুই লাখ টাকা।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি থেকে বিভিন্ন আসবাব ও ওষুধসামগ্রীর পাশাপাশি দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, দুটি প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) এবং তিনটি স্টিলের আলমারি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা।
 
আলট্রাসনোগ্রাম বন্ধ, রোগীদের বাড়তি খরচ
হামলার এক মাস পরও রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়নি। বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ ও ইপিআই টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকলেও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা এখনও শুরু করা যায়নি। এতে গর্ভবতী নারীদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এই কেন্দ্রে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে খরচ হতো ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। অন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একই পরীক্ষার জন্য এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা বা তারও বেশি লাগে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার রাজধানীর গাবতলী থেকে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে আসেন রাশেদা জামান (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, এ কেন্দ্রে এখনও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা চালু হয়নি, তা জানা ছিল না। এখানে এসে জানা গেল। এখন বাধ্য হয়েই  অন্য একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় জরুরি ভিত্তিতে নতুন আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পরিচালক আহসান হাবীব জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানটি একটি অলাভজনক সংস্থা। নিজস্ব আয় দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন স্থাপনের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, আগামী মাসের শেষের দিকে মেশিনটি স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন আবার পূর্ণাঙ্গভাবে সেন্টারের কার্যক্রম চালু হবে।’

পাঁচ দশক ধরে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রকল্প হিসেবে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানটি প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, শিশুদের টিকাদান এবং শিশুস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়েও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম রয়েছে। এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা এবারই প্রথম। তবে জমি দখলকে কেন্দ্র করে ২০০৯ সালেও প্রতিষ্ঠানটির জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা ।