বাংলাদেশের ধান-চালের অসম অর্থনীতি

এম এম মুসা: হাওড়ের এক ঘাটে সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছেন এক কৃষক। সামনে একশ বস্তা বোরো ধান। কিছুটা ভেজা, কিছুটা বিবর্ণ। এপ্রিলের শেষে ঢল আর বৃষ্টিতে সাত হাওড় জেলায় প্রায় ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছিল। তার ধান কোনোমতে বাঁচানো গেছে, শুকানো যায়নি। 

ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। দর হাঁকছেন মণপ্রতি ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা। কৃষক মনে মনে হিসাব কষেন। কৃষকদের ভাষ্য, এবার মণপ্রতি খরচ পড়েছে ১ হাজার ২০০ টাকারও বেশি। চাষের টাকা ধার করা। এই দামে বেচলে নৌকাভাড়া আর বস্তা নামানোর মজুরি ওঠে কি না সন্দেহ। 

ঢাকার খুচরা বাজারে সেই একই মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাঠের ধানের দামের কয়েক গুণ।  একই ফসলের এক প্রান্তে কৃষকের লোকসান অন্য প্রান্তে ভোক্তার পকেটে চাপ। মাঝখানে কারা? আজকের প্রশ্ন তাই একটাই: খাদ্যের দাম আসলে কার নিয়ন্ত্রণে?

হিসাব মিলছে না কিন্তু কেন?
এবার সরকার বোরো ধান কিনেছে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকায়। গত বছরের দামই বহাল রাখা হয়েছিল। কেনার লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ টন ধান। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বোরোর উৎপাদন খরচ কেজিতে ৩২ টাকা ৯৭ পয়সা। কৃষকরা বলেন, এ হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।  আসলে দুই পক্ষের অঙ্ক খুব দূরে নয়। এক মণ ধান প্রায় ৩৭ কেজি। মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ মানে কেজিতে ৩২ টাকার কাছাকাছি। মন্ত্রণালয়ের অঙ্কের প্রায় সমান। তাহলে ক্ষতিটা হলো কোথায়?

ক্ষতিটা হলো সরকারি দর আর খোলাবাজারের দরের ফাঁকে। হাওড়ের কৃষকরা জানিয়েছেন, মৌসুমের শুরুতে মণপ্রতি সাড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পাওয়া গেলেও পরে দাম নেমে এসেছে ৬০০ টাকায়। উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক। কেজির হিসাবে ১৬ টাকার সামান্য বেশি। 

দাম কেন পড়ল? মিলমালিকরা বলছেন, গুদামে মজুদ ছিল যথেষ্ট তাই নতুন ধান কেনার আগ্রহ কম। সরকারি ক্রয় কি এই ঘাটতি পূরণ করতে পারত? এক শীর্ষ মিলমালিকের মতে, সরকার কিনবে উৎপাদনের ক্ষুদ্র একটি অংশ তাই বাজারে তার প্রভাব সামান্যই। যাদের ধান বৃষ্টিতে ভিজেছে তাদের হাতে সময়ও ছিল না। মজুদ করতে না পেরে অনেকে সরকারি ক্রয় শুরুর আগেই মিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে ধান বেচে দিয়েছিলেন। 

খরচ বাড়ে কেন
সম্প্রতি সরকার আবার জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে এখন ১৩৫ টাকা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ইরান যুদ্ধের জেরে আমদানি খরচ বাড়ার কথা। সময়টাও কঠিন। আমনের মৌসুম চলছে। নভেম্বর থেকে ফসল কাটা শুরু হবে তখন ডিজেলে চলা কম্বাইন হার্ভেস্টার আর মাড়াই যন্ত্রের খরচও বাড়বে। তারপর আসবে বোরো। 

কৃষির ডিজেলনির্ভরতা বিশাল। দেশে ২১ লাখের বেশি কৃষিযন্ত্র আছে, তার মধ্যে ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প। এপ্রিলে আগের দফা দাম বাড়ার পর লালমনিরহাটে বিঘাপ্রতি ধান কাটার যন্ত্রভাড়া ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা হয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। 

সারের গল্প আলাদা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সারের সংকট চলছে। কৃষিমন্ত্রীর ভাষ্য, একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে এবং পুলিশ তাদের শনাক্ত করছে। এখানে একটা প্রশ্ন না করে উপায় নেই। ডিজেলের দাম ঠিক করে কে? সরকার। সারের দাম? সরকার। কেউ কেউ বলবেন, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম বেড়েছে, সরকারের কী করার আছে। কথাটা অর্ধেক সত্য। বিশ্ববাজার চাপ দেয়, ঠিক। কিন্তু সেই চাপ কৃষকের ঘাড়ে কতটা যাবে আর রাষ্ট্র কতটা নিজে নেবে সেটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের কথায়, উপকরণের দামের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ সীমিত আর উৎপাদন থেকে তারা যা পান তাও তুলনায় কম। অর্থাৎ খরচের দিকে কৃষকের ক্ষমতা প্রায় শূন্য। সেখানে হাতে সুতো আছে সরকার আর বিশ্ববাজারের।

ধান থেকে ভাত: মাঝখানের পথ
মাঠ থেকে থালা পর্যন্ত পথটা লম্বা। ধান যায় আড়তদারের কাছে, সেখান থেকে মিলে, মিল থেকে পাইকারি বাজারে, তারপর খুচরা দোকানে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালের সরবরাহ-শৃঙ্খলে অনেক পক্ষ থাকায় শেষ পর্যন্ত খরচ চড়ে যায় ভোক্তার দিকে। ধানের উৎপাদন খরচ, মিলিং খরচ আর অদক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থাকে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

একটা মোটা হিসাব করা যাক। এক কেজি চাল বানাতে সাধারণত দেড় কেজির মতো ধান লাগে। ৬০০ টাকা মণ দরে ধানের দাম পড়ে কেজিতে ১৬ টাকার একটু বেশি। তাহলে এক কেজি চালের কাঁচামাল প্রায় ২৪ টাকার। খুচরায় বিক্রি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। ফারাক ২৬ থেকে ৩১ টাকা।

এই ফারাকের সবটা মুনাফা নয়। এতে আছে মিলিং, পরিবহন, বস্তা, গুদাম, ব্যাংকের সুদ, আড়তদার আর পাইকারের কমিশন। কিন্তু কতটা ন্যায্য খরচ আর কতটা বাড়তি মুনাফা তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব দেশে নেই। আর অন্ধকার যেখানে সেখানেই সিন্ডিকেটের গল্প জন্মায়।

আরেকটা হিসাব আরও অস্বস্তিকর। কৃষকের ন্যায্য খরচ যদি কেজিতে ৩২ টাকা ধরি তাহলে এক কেজি চালের সমান ধান ফলাতেই তার খরচ প্রায় ৪৮ টাকা। খুচরা দামের প্রায় সমান। অর্থাৎ কৃষককে সত্যিই খরচ তুলে দিতে হলে মাঝের সব ধাপ প্রায় বিনা খরচে চলতে হবে নইলে চালের দাম আরও বাড়বে। সস্তা ভাতের একটা মূল্য আছে। এত দিন সেই মূল্য দিয়ে এসেছেন কৃষক।

ভোক্তার দিকে চাপ তবু কমেনি। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমেছে ঠিকই কিন্তু সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরেই আছে আর শুধু আগস্ট মাসেই খাদ্যপণ্যের দামের সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ধানের দাম নামছে, সবজির দাম চড়ছে। 

সরকারের নীতি: কতটা ঠিক, কতটা ভুল
সরকার কিছুই করছে না— এ কথা ন্যায্য হবে না। কৃষিমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, সিন্ডিকেটের কারণে কৃষক ন্যায্য দাম পান না আর সার-বীজ-কীটনাশকের দামও চড়া। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি সেবা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। হাওড়ে সংকট বুঝে ছয় হাওড় জেলায় বোরো ধান কেনা ১২ দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। মৌসুমে ধান, চাল ও গম মিলিয়ে ১৮ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক হয়েছে; সিদ্ধ চালের দাম ৪৯ টাকা, আতপ ৪৮ টাকা। 

এগুলো ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু চারটা প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, খরচ বাড়ার মুখে ক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখা। মন্ত্রণালয়ের নিজের হিসাবেই মার্জিন মাত্র কয়েক টাকা। সেখানে একটা প্রতিকূল বছরে একই দাম মানে বাস্তবে বাড়তি ঝুঁকি কৃষকের কাঁধে চাপানো। দ্বিতীয়ত, ক্রয়ের পরিমাণ। কেনা হবে উৎপাদনের ছোট একটা অংশ। বাকি বিশাল অংশের কৃষক থাকবেন বাজারের দয়ায়। তৃতীয়ত, ডিজেলের দাম বাড়ানোর সময় কৃষির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আমন কাটার আগে আর বোরো লাগানোর আগে দাম বাড়ানোর সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। চতুর্থত, ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটির ব্যবহার। সিন্ডিকেট থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রমাণ দেখাতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সব সংকটের ব্যাখ্যায় একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেটকে দাঁড় করিয়ে দিলে নীতির দায় ঢাকা পড়ে যায়। যে দাম সরকার নিজেই ঠিক করে তার দায় অন্য কারও ঘাড়ে চাপানো যায় না।

অন্যদের অভিজ্ঞতা কী
জাপানের উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। ২০২৫ সালে দেশটিতে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। জরুরি মজুদ ছাড়তে হয়েছিল, কৃষিমন্ত্রীকে পদত্যাগও করতে হয়েছিল। ধনী, সংগঠিত, তথ্যসমৃদ্ধ একটা দেশেও বিতরণ-ব্যবস্থার অস্বচ্ছতা দাম নিয়ে কতটা অন্ধকার তৈরি করতে পারে এটা তার প্রমাণ। জাপানের শিক্ষা হলো, মজুদ আর বিতরণের তথ্য জনসমক্ষে না থাকলে দাম ‘ব্যাখ্যাহীন’ থেকে যায়।

থাইল্যান্ডের কথা উল্টো দিক থেকে শেখায়। ২০১১ সালে সেখানে কৃষকদের কাছ থেকে বাজারদরের অনেক ওপরে ধান কেনার একটি কর্মসূচি চালু হয়েছিল। কৃষকরা খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু গুদাম ভরে উঠল, রপ্তানি আটকে গেল, রাষ্ট্রের লোকসান বিশাল হলো। শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক শিনাওয়াত্রা আদালতে দণ্ডিত হলেন। ফলে অসীম দায়ের ন্যূনতম মূল্য রাষ্ট্র বইতে পারে না। উদারতারও একটা সীমা রয়েছে। 

ভারতে আছে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আর সরকারি সংস্থার নিশ্চিত ক্রয়। পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকরা এর সুফল পান। কিন্তু সুবিধাটা কিছু রাজ্যেই কেন্দ্রীভূত আর ধান চাষের এই নিশ্চয়তা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ফলাফল- নিশ্চিত দাম আর নিশ্চিত ক্রয় আলাদা জিনিস আর একটা কেবল কিছু মানুষের কাছেই পৌঁছায়।

কী করতে হবে
ধান কাটার আগে, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিয়ে খরচ নির্ধারণ করতে হবে। জমির ভাড়া আর পরিবারের শ্রম হিসেবে ধরতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অঙ্ক আর কৃষকের অঙ্কের তর্ক তখন থামবে। দ্বিতীয়ত, সবাইকে ভর্তুকি না দিয়ে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ছোট ও প্রান্তিক চাষিকে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া যায়। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা জরুরি। তৃতীয়ত, ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। ১২ লাখের বেশি ডিজেলের সেচপাম্পের একটা অংশ সৌরশক্তিতে নেওয়া গেলে জ্বালানি দামের ঝাঁকুনি কৃষক কম টের পাবেন। এটা দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু আজই শুরু করতে হবে। চতুর্থত, কেনার আয়োজন বড় করতে হবে। ক্রয়ের অংশ ধাপে ধাপে বাড়ানো যায়। আর্দ্রতা-সহনীয় মান, শুকানোর কেন্দ্র, উপজেলা পর্যায়ে খোলা ক্রয়কেন্দ্র থাকলে ভেজা ধানের কৃষক বাদ পড়বেন না। থাই অভিজ্ঞতা মনে রেখে রাজস্বের সীমা আগেই ঠিক করা চাই। পঞ্চমত, সাইলো, গুদাম-রসিদভিত্তিক ঋণ আর সমবায়ভিত্তিক শুকানোর ব্যবস্থা থাকলে কৃষককে ফসল উঠতেই জলের দামে বেচতে হবে না। ষষ্ঠত, বাজারের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উপজেলাভিত্তিক দৈনিক ধান-চালের দর প্রকাশ, বড় মিলের মজুদের তথ্য এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের মাধ্যমে চালের সরবরাহ-শৃঙ্খলে সমীক্ষা। সিন্ডিকেট আছে কি নেই, তথ্যই সে প্রশ্নের জবাব দেবে। সপ্তমত, হাওড়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। দ্রুত পাকা জাত, সূচকভিত্তিক শস্যবিমা, আগাম সতর্কতা। প্রতি বছর ঢলে ফসল ডুবে গেলে ক্ষতিটা শুধু কৃষকের থাকে না, দেশের খাদ্যনিরাপত্তারও হয়। অষ্টমত, আমদানি-শুল্কে পূর্বানুমেয় নিয়ম নির্ধারণ করতে হবে। হঠাৎ শুল্ক কমানো-বাড়ানো ব্যবসায়ী আর কৃষক দুজনের জন্যই অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটা স্বচ্ছ দামের পরিসর ঠিক করা গেলে সেই অনিশ্চয়তা কমে।

উন্নয়নকর্মী ও গবেষক