নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে মতবিরোধে জড়িয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যাংকাররা। একপক্ষ চায় ঋণ পুনঃতফসিল করে নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খোলার সুযোগ দিয়ে গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখা হোক। অন্যপক্ষের অবস্থান নতুন অর্থায়নের আগে কারখানা ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বলছেন, পুরোনো ঋণের সুরাহা না করে নতুন অর্থায়ন করলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি আরও বাড়বে।
এই টানাপড়েনের মধ্যে সিটি গ্রুপের ঋণসংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিসহায়তায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে গ্রুপটির ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ ছিল। এরপর নতুন কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য জানা যায়নি। ফলে বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ঋণের শ্রেণিমান নির্ধারণ এবং ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায় নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একাধিক ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নিচ্ছে। আবার কিছু ব্যাংক পাওনা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নিয়ে আবারও আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র, একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সিটি গ্রুপের আর্থিক বিষয় দেখভাল করেন এমন একজন কর্মকর্তা এ তথ্যগুলো নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমিয়ে দেওয়ায় বাজারে সিটি গ্রুপের ‘তীর’ ব্র্যান্ডের পণ্যের সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পুঁজিবাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল গ্রুপটি। এজন্য ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট এবং ব্যাংকিং পার্টনার হিসেবে ওয়ান ব্যাংককে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), করপোরেট বন্ড, সুকুক বা প্রেফারেন্স শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা থাকলেও সেই উদ্যোগ এখন থমকে গেছে।
ঝুঁকিতে ৪৭ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের স্থিতি ছিল ২৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ১৬ হাজার ২৪৬ কোটি এবং নন-ফান্ডেড ঋণ ৭ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
গ্রুপটির ঋণের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে গত মার্চ পর্যন্ত এইচএসবিসির পাওনা ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৪৪০ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ১ হাজার ১৬৭ কোটি এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনা ছিল প্রায় ৯৮৬ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের ভাষ্য, সিটি গ্রুপের ঋণের একটি বড় অংশের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিসহায়তার কারণে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে এসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানোর সুযোগ ছিল। তবে ঋণের প্রকৃত অবস্থা, শ্রেণিমান নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ নিয়ে এখন ব্যাংকগুলোকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গত ৩১ মার্চ সিটি গ্রুপের আবেদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছিল, নির্দিষ্ট শর্তে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রুপটির ঋণ নিয়মিত রাখা যাবে। তবে ঋণের শ্রেণিমান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। প্রকৃত আদায় ছাড়া সুদ আয় হিসেবেও দেখানো যাবে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের আশঙ্কা, এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্র্যাক, সিটি, প্রাইম, ইস্টার্ন, পূবালী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসিসহ ঋণখেলাপির তুলনামূলক কম হার থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থায়। তবে প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের শ্রেণিমান নির্ধারণ, আদায় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংরক্ষণের ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সিটি গ্রুপের ঋণ প্রসঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বন্ধ কলকারখানা সচল রাখা এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। সিটি গ্রুপসহ যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে সেগুলোর সমাধানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত না নিয়ে ব্যাংক, গ্রাহক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা হবে।
তিনি বলেন, সিটি গ্রুপের ঋণের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকের নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। বিশাল এ ঋণ নিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতি সচল রাখতে গভর্নরও এ সমস্যাগুলো সমাধানে সচেষ্ট রয়েছেন।
নতুন ঋণ, নাকি সম্পদ বিক্রি আগে
সিটি গ্রুপের ঋণসংকট মোকাবিলায় ব্যাংকারদের মধ্যে দুটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। একপক্ষ গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখতে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিল এবং নতুন করে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে। অন্যপক্ষের বক্তব্য সম্পদ বিক্রি ও ঋণ পরিশোধের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়া নতুন অর্থায়ন করলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি কমবে না।
সূত্রমতে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে ইউসিবি, পূবালী ও ডাচ্-বাংলাসহ কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা সিটি গ্রুপের ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে পুনঃতফসিলের পক্ষে। একইসঙ্গে গ্রুপটির পণ্য আমদানির জন্য নতুন করে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিয়ে ব্যবসা সচল রাখার পক্ষেও তারা অবস্থান নিয়েছেন।
এই পক্ষের যুক্তি, সিটি গ্রুপের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকের পাওনা আদায় আরও কঠিন হতে পারে। তাই ব্যবসা চালু রেখে ধাপে ধাপে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও গ্রুপটির ব্যবসা সচল রাখার নির্দেশনা এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য।
এ প্রসঙ্গে মাসরুর আরেফিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সিটি গ্রুপের কারখানাগুলো সচল রাখা এবং ব্র্যান্ডের সুনাম ধরে রাখতে কয়েকটি ব্যাংককে দিয়ে নতুন করে ঋণসুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে যাতে গ্রুপটি নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারে। তিনি বলেন, সিটি গ্রুপ কিছু সম্পদ বিক্রি করবে। সেসব সম্পদ বিক্রির পর অবশিষ্ট ঋণ পুনঃতফসিল করা হবে। গ্রুপটির মোট প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
মাসরুর আরেফিন আরও বলেন, কয়েকটি ব্যাংক মিলে যে তহবিল দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা পাওয়া গেলে সিটি গ্রুপের সংকট সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় অঙ্কের ঋণের বিষয়ে সব ব্যাংক একসঙ্গে সব প্রস্তাবে সম্মত হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে তিনি এ বিষয়ে আশাবাদী বলেই জানান।
যদিও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও প্রাইম ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, সিটি গ্রুপের চলতি মূলধনের বিপরীতে যে পরিমাণ পণ্য থাকার কথা, বাস্তবে তার সামান্য অংশও গুদামে বা অন্য কোথাও নেই। পণ্য বিক্রির অর্থ দিয়ে গ্রুপটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় বিনিয়োগ করেছে। ফলে চলতি মূলধনের অর্থ আটকে গিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।
এই ব্যাংকারদের অবস্থান, কারখানা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ঋণ কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে সিটি গ্রুপকে। তাদের মতে, নতুন অর্থায়নের আগে বিদ্যমান ঋণসংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে তার সমাধান করা জরুরি। শুধু ঋণ পুনঃতফসিল ও নতুন ঋণপত্র খোলার সুযোগ দিয়ে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ১০৯ একর জমিতে ছয়টি বড় কারখানা প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় সেগুলো বছরের পর বছর উৎপাদনে যেতে পারেনি। কারখানাগুলো প্রকল্পঋণের বদলে চলতি মূলধনের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য। ফলে এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় গ্রুপটির আর্থিক চাপ বেড়েছে।
এ অবস্থায় কারখানা বা অন্য প্রকল্প বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি চাইছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকাররা। তবে সিটি গ্রুপ এখনও এ বিষয়ে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি বলে সূত্রগুলোর দাবি।
সিটি গ্রুপের ঋণ প্রসঙ্গে ইউসিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের অন্যতম এ গ্রুপকে নীতিগত সহায়তা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ ব্যাংক। ইউসিবিও চায় সিটি গ্রুপ ঘুরে দাঁড়াক। এটিই দীর্ঘমেয়াদে সংকট সমাধানের কার্যকর পথ যা দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, সিটি গ্রুপের অলাভজনক কারখানা বা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান। শুধু সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করলে সিটি গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রম টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, আগে সিটি গ্রুপের ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে দুটি পক্ষ ছিল। তবে এখন দুই পক্ষই একটি সমন্বিত অবস্থানে এসেছে। এ ক্ষেত্রে অলাভজনক কারখানা বা প্রতিষ্ঠান বিক্রির মাধ্যমে ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলবে। পাশাপাশি নীতিগত সহায়তা দিয়ে গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখার উদ্যোগও নেওয়া হবে যাতে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়। এখন আর এখানে কোনো পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় নেই; বরং দুটি প্রক্রিয়াই পাশাপাশি চলবে।
যদিও ইউসিবির আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি। এছাড়া এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে ব্যাংকটির জনসংযোগ শাখা থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে বলা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদ বিক্রির চেষ্টা তবে ক্রেতা মিলছে না
ঋণসংকট কাটাতে দীর্ঘদিন ধরেই সম্পদ বিক্রির সম্ভাবনা খুঁজছে সিটি গ্রুপ। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি কারখানা কিংবা পুরো প্রকল্প বিক্রি করে ঋণের বোঝা কমানো। এ ছাড়া গ্রুপটির মালিকানাধীন আটটি চা-বাগান এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রির সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকির জন্য আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংকে (ইওয়াই) নিয়োগ দিয়েছে গ্রুপটি।
সিটি গ্রুপের সূত্রের দাবি, প্রকল্প কেনার বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপ, আকিজ রিসোর্স গ্রুপ ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই কিনতে রাজি হয়নি। কয়েকটি সম্ভাব্য ক্রেতা ‘তীর’ ব্র্যান্ডসহ গ্রুপটির মূল ব্যবসা অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখালেও সিটি গ্রুপ তাতে রাজি হয়নি বলে সূত্রের ভাষ্য।
এদিকে চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও প্রকল্প বিক্রির বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে সেই আলোচনাও চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রকল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহ কম। ফলে সম্পদ বিক্রি করে ঋণ কমানোর যে পথকে কয়েকটি ব্যাংক সংকট সমাধানের প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছে, সেই পথও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
যেভাবে উত্থান হয় সিটি গ্রুপের
১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় ছোট একটি সরিষার তেলের মিল দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সিটি গ্রুপ। সেই উদ্যোগ থেকে বর্তমানে গ্রুপটির অধীনে রয়েছে ৪০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। ভোগ্যপণ্যের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা গ্রুপটির ‘তীর’সহ একাধিক পরিচিত ব্র্যান্ড রয়েছে। ‘রূপসী ফুডস’-এর অধীনে উৎপাদিত হয় বিস্কুট, কেক ও ক্যান্ডি। মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে রয়েছে গ্রুপটির তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চল।
২০২৩ সালে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর গ্রুপটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তার ছেলে ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই শিল্পগোষ্ঠীর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ— ব্যবসা সচল রাখা, ব্যাংকের আস্থা ফেরানো এবং বিপুল ঋণের বোঝা সামাল দেওয়া। কিন্তু নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসা চালু রাখার পক্ষ এবং সম্পদ বিক্রি করে আগে ঋণ কমানোর পক্ষে থাকা ব্যাংকারদের মধ্যে মতপার্থক্য না কাটলে সিটি গ্রুপের ঋণসংকটের সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে।