নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১ সামনে রেখে বাংলাদেশের জন্য ৯ হাজার ২৩ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা অনুদান হিসেবে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশের ৩৩টি নাগরিক ও উন্নয়ন সংগঠন। একই সঙ্গে নতুন প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনগুলো।
গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় ৩৩টি নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও যুব নেটওয়ার্কের উদ্যোগে প্রণীত ‘জনগণের নেতৃত্বে নীতি প্রণয়ন: বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় অবস্থানপত্র প্রকাশ করা হয়।
অবস্থানপত্রে বলা হয়, বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ বন্যা, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও বাস্তুচ্যুতিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত পরিস্থিতির তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার রয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব উদ্যোগে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় অতিরিক্ত ৫ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অবস্থানপত্রে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ৯০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ২৩ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সংগঠনগুলোর দাবি, এ অর্থ অনুদান সমতুল্য সহায়তা হিসেবে দিতে হবে, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা না বাড়ে।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সীমিত বাজেট নিয়েও বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এই সহায়তা মূলত অনুদান হিসেবে আসা প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে, অসময়ের বন্যায় ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি জানান, কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তুলে ধরতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশেষ ‘জুট প্যাভিলিয়ন’ নিয়েছে।
অবস্থানপত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বিদ্যুৎ সঞ্চয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারী, শিশু, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জলবায়ু নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে সহজে সহায়তা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী, নাইকমের নির্বাহী পরিচালক এস এম মনজুরুল হান্নান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সি৩ইআরের পরিচালক মো. গোলাম রব্বানী ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পরিচালক পার্থ হেফজ শেখ।