তিন দিনের সপ্তাহে লেনদেনে খরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দুর্গাপূজার ছুটির কারণে গত সপ্তাহের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ছিল মাত্র তিন কার্যদিবসের। সংক্ষিপ্ত এই সপ্তাহে ডিএসইতে প্রধান সূচক প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও দেখা গেছে চরম লেনদেনের খরা। ট্রেডিং টার্মিনালে কারিগরি বিভ্রাট, কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ও আর্থিক প্রতিবেদন ঘোষণার মৌসুমে বিনিয়োগকারীদের পর্যবেক্ষণমুখী অবস্থান এবং বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনার অভাবে দৈনিক গড় লেনদেন নেমে এসেছে প্রায় ১০ মাসের সর্বনিম্নে। পুরো সপ্তাহে সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও পচা শেয়ারে (জাঙ্ক শেয়ার) বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তোলার প্রবণতাই ছিল সবচেয়ে বেশি।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সপ্তাহ শেষে মাত্র ১ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কমে অবস্থান করছিল ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৬৩ পয়েন্টে। তবে বড় মূলধনি ৩০টি কোম্পানির সূচক ডিএস৩০ ৬ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১০৩ দশমিক ৪০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। শরিয়া সূচক ডিএসইএস ৭ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০ দশমিক ৪০ পয়েন্টে। স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বা এসএমই সূচক ডিএসএমইএক্স ৩ দশমিক ২২ পয়েন্ট কমে ৯৬৪ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে অবস্থান করছিল। তিন দিনে ডিএসইর বাজার মূলধন ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকায়।

সংক্ষিপ্ত সপ্তাহে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১৮৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা যা পাঁচ কার্যদিবসের আগের সপ্তাহের ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। দৈনিক গড় লেনদেনের হিসাবে গত সপ্তাহে লেনদেন হয়েছে ৩৯৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহের দৈনিক গড় লেনদেন ৪৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার তুলনায় যা ১৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ কম। সপ্তাহের মাঝে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের ট্রেডিং টার্মিনালে কারিগরি জটিলতার কারণে লেনদেন ব্যাহত হওয়াও এর অন্যতম কারণ।

চলতি সপ্তাহে বাজারের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আশ্চর্যজনক দিক ছিল চমৎকার আর্থিক পারফরম্যান্স দেখানো কোম্পানির শেয়ারে বড় দরপতন এবং পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকা দুর্বল ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের লাফিয়ে দরবৃদ্ধি। অর্ধবার্ষিক বা বার্ষিক আর্থিক ফলাফলে বড় ধরনের লাফ দেওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আকস্মিক মুনাফা তোলার তাড়নায় দর হারিয়েছে শীর্ষ সারির ভালো কোম্পানি।

যেমন, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আয়প্রতি মুনাফায় (ইপিএস) ৩১২ দশমিক ৪ শতাংশ রেকর্ড প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ২৫ শতাংশ নগদ ও ২৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করা সত্ত্বেও কোম্পানিটির শেয়ার দর সপ্তাহের ব্যবধানে ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ কমেছে। একইভাবে এনভয় টেক্সটাইল ও বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস ভালো ফল দেখালেও বিক্রির চাপে সূচক টেনে নামাতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক সূচক ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে।

বিপরীতচিত্রে, দরবৃদ্ধির তালিকায় আকস্মিক আধিপত্য দেখিয়েছে পচা বা বন্ধ শেয়ার। ডিএসইর সাপ্তাহিক শীর্ষ দরবৃদ্ধির তালিকায় এক নম্বরে উঠে এসেছে ‘জেড’ ক্যাটাগরির আরএসআরএম স্টিল। কোম্পানিটির শেয়ারদর ১৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ টাকা ৪০ পয়সায়। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফিনিক্স ফাইন্যান্সের (জেড ক্যাটাগরি) দর বেড়েছে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে দীর্ঘমেয়াদি ধরে রাখার আস্থা না পেয়ে স্বল্পমেয়াদে জাঙ্ক শেয়ারে দ্রুত মুনাফা নেওয়ার প্রবণতাই এখানে স্পষ্ট।

খাতভিত্তিক লেনদেনে বরাবরের মতো একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল বস্ত্র খাত। ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৩ দশমিক ৩৪ শতাংশই এসেছে এই খাত থেকে যেখানে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যাংক খাতের অবদান ছিল ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ (দৈনিক গড় ৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা) এবং সাধারণ বীমা খাতের অবদান ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ (দৈনিক গড় ৪৮ কোটি ১১ লাখ টাকা)।

সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির মধ্যে ১২৬টির দর বেড়েছে, ২১৩টির দর কমেছে এবং ৪২টির দর অপরিবর্তিত ছিল। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে ইতিবাচক আভাস দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এলসি খোলা ১৮ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি ১০ শতাংশেও বেশি বেড়েছে। আমদানির এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত গতি ফিরতে পারে।