ইরান যুদ্ধ আবার শুরু হলে কতটা সামাল দেওয়া যাবে?

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায় ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে। ইরান যুদ্ধ অবসানের কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাতেই আছে। গত বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ২ ডলারের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ ডলার ৮৫ সেন্টে, যা পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

প্রণালির একটি পয়েন্টে মাইন বিস্ফোরণে দুটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায় বলে এর আগের দিন জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সাত ট্যাংকারে হামলার তথ্য আইআরজিসি দিলেও তা নাকচ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। সেপ্টেম্বরে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনে বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি এলাকা দখল করে নিলে তেল সরবরাহ কমে যায়। সার্বিক পরিস্থিতিতে কমছে জ্বালানি তেলের মজুত এরই মধ্যে নেমেছে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

কৌশলগত তেল মজুত হলো অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির এমন ভাণ্ডার, যা সরকার বা তাদের পক্ষে কোনো কোম্পানি জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহের জন্য সংরক্ষণ করে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর, ১১ মার্চ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হয়। এটি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর বাজারে ছাড়া তেলের পরিমাণের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি। আইইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ (এসপিআর) থেকে ১৭২ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল এবং জাপান ৭৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ বলছে, এসপিআরের পরিমাণ এরই মধ্যে কমে ২৮৩ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। 

পুরোদমে আবার ইরান যুদ্ধ শুরু এবং হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি হুতি হামলায় বাব আল-মানদাব প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে সরবরাহ ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল কি বিশ্বের কাছে মজুত রয়েছে— বিশ্লেষকদের কাছে প্রশ্ন রেখেছিল আল-জাজিরা।  

স্পার্টা কমোডিটিসের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক অ্যারন কিলডো আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, চীন ও ইরান বাদে বিশ্বজুড়ে কৌশলগত তেলের মজুদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ থেকে প্রায় ৩২৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে; এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের অংশই প্রায় ৯৫ শতাংশ।

তার হিসাবে, জ্বালানির বৈশ্বিক মজুত আছে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো। এই হিসাবের মধ্যে চীনের মজুত অন্তর্ভুক্ত নয়— যা রপ্তানি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মজুতও এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ওই অঞ্চল থেকে আর সরবরাহ হবে না। কিলডোর মতে, ইউরোপের হাতে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে, যা এখনও কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বরাদ্দ করা হয়নি। তবে জার্মানির মতো সদস্যরা কিছু অংশ স্থানীয় জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রেখে দিয়েছে।

ইতোমধ্যে, চীনে অপরিশোধিত তেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ব্যারেলে, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ব্যারেল। তবে বর্তমান মজুত দিয়েও শোধনাগারগুলোর প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘কেপলারের’ জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশেষজ্ঞ মুয়ু জু। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের কাছে থাকা মজুদ দিয়ে আট দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে, বিশ্বের তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ— অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হতো। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পূর্ব দিকের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে পশ্চিম উপকূলে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সেই পাইপলাইনে হামলা হওয়ায় ট্যাংকারগুলোকে বাব আল-মানদাব প্রণালি ব্যবহার করতে হচ্ছে। জুলাইয়ে এই প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছিল হুতিরা। 

জু’র ভাষ্যমতে, চলতি মাসে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের সরবরাহ করা অপরিশোধিত তেলের মধ্যে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল (প্রতিদিন) বাব আল-মানদাব প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। বর্তমানে ইয়ানবু থেকে পাঠানো তেলের বড় অংশই মিসরের ভেতর দিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছে। জু বলেন, হরমুজ বন্ধ গেলে এবং হুতিরা সব সৌদি ট্যাংকারকে আটকে দিলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কেবল কয়েকটি পাইপলাইন এবং ইয়ানবু থেকে উত্তরমুখী রুট ব্যবহার করেই পণ্য রপ্তানি করা যাবে। তার হিসাবে, এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বর্তমানের ১৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে নামবে ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা দৈনিক ৯ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেলের ঘাটতি তৈরি করবে।

আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প বলেন, কোভিড মহামারির সময় কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেনি। তেল সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিকই ছিল, কিন্তু এবার তেমন হবে না বলেই মনে হচ্ছে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।  

বিশ্বে আক্ষরিক অর্থেই তেলের মজুত শেষ হয়ে যাবে না। বরং তেলের দাম এতটাই বেড়ে যাবে যে চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। বিউচ্যাম্প বলেন, প্রতি ব্যারেলের দাম ১৫০ ডলারে উন্নীত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চাহিদা কমবে উল্লেখযোগ্য হারে। 

কিলডোর তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে  উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বেশিরভাগ পণ্যই রপ্তানি হয়েছে এশিয়ায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান।  তাদের জন্য নিকটবর্তী বিকল্প উৎস হলো পশ্চিম আফ্রিকা। কিন্তু এই অঞ্চল থেকে সমুদ্রপথে পণ্য পৌঁছাতে ২৫ থেকে ২৮ দিন লাগে। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে লাগে মাত্র দুই দিন।

তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে তেল কোম্পানিগুলোর। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত যখন চরমে, তখন এক্সনমোবিল আয় করে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে শেভরনের আয় ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শেলের আয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে পৌঁছেছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে। এই বিপুল মুনাফার পেছনে প্রধান কারণ- তেলের উচ্চমূল্য।

জু বলেন, এবার বড় কোনো সংঘাত হলে তেল শোধনাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং রাশিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।

তিনি আরও বলেন, এতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদনকারীরা অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য থেকে লাভবান হতে পারবে। সেইসঙ্গে তাদের পরিবহন খরচও কমতে পারে।