জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে যদি বিপুল অর্থ খরচ হয়, সেই বিনিয়োগের লাভ আসবে কোথা থেকে? ইলন মাস্কের লক্ষ্য শুধু মঙ্গলে কয়েকজন মানুষ পাঠানো নয়, বরং সেখানে একদিন স্বনির্ভর সভ্যতা গড়ে তোলা। কিন্তু একটি শহর বানাতে লাগবে লাখো মানুষ, বিপুল পরিমাণ কার্গো, শক্তি ও অবকাঠামো। তাহলে প্রশ্ন হলো, মঙ্গল কি ভবিষ্যতে ব্যবসা থেকে আয় করবে, নাকি এটি হবে মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ?
ইলন মাস্কের মঙ্গল স্বপ্নের মূল কথা শুধু সেখানে গিয়ে পতাকা ওড়ানো নয়। লক্ষ্য হলো এমন একটি স্বনির্ভর শহর তৈরি করা, যেখানে মানুষ পৃথিবীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বসবাস করতে পারবে। স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এমন একটি স্বনির্ভর শহরের জন্য প্রয়োজন হতে পারে ১০ লাখের বেশি মানুষ এবং কয়েক মিলিয়ন টন কার্গো।
কিন্তু এখানেই অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। এত মানুষ ও সরঞ্জাম মঙ্গলে পাঠাতে খরচ কত হবে?
স্পেসএক্সের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলে গবেষণা ও অনুসন্ধানের জন্য কার্গো ফ্লাইট ২০২৮ সালের আগে শুরু হওয়ার কথা নয় এবং প্রস্তাবিত মূল্য প্রতি মেট্রিক টনে ১০ কোটি ডলার। যদিও এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বাস্তব বাণিজ্যিক খরচ সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।
অর্থাৎ মঙ্গলের প্রথম অর্থনীতি সম্ভবত লাভের চেয়ে বিনিয়োগনির্ভর হবে। পৃথিবী থেকে রকেট, যন্ত্রপাতি, খাবার, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী পাঠাতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে। তাই শুরুতেই মঙ্গল থেকে কোনো সাধারণ পণ্য পৃথিবীতে এনে লাভ করার ধারণা খুব বাস্তবসম্মত নয়।
তাহলে লাভটা কোথায়?
প্রথম সম্ভাবনা হলো স্থানীয় সম্পদ। মঙ্গলের মাটি, বরফ, বায়ুমণ্ডল এবং অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে পানি, অক্সিজেন, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী তৈরি করা গেলে পৃথিবী থেকে সরবরাহের খরচ কমানো সম্ভব। নাসার গবেষণাতেও মঙ্গলের স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারকে ভবিষ্যৎ বসতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা নতুন শিল্প। স্পেসএক্স নিজেই বলছে, স্থায়ী মঙ্গল শহর তৈরি করতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সম্পদ উত্তোলন, জ্বালানি উৎপাদন, নির্মাণ, যোগাযোগ ও পরিবহনের মতো নতুন শিল্প প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ মঙ্গলের অর্থনীতি শুরু হতে পারে মূলত নিজেদের বসতি চালানোর প্রয়োজন থেকেই।
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো প্রযুক্তিগত লাভ। মঙ্গলে টিকে থাকতে গিয়ে উন্নত রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, শক্তি ব্যবস্থাপনা, পানি পুনর্ব্যবহার, বন্ধ পরিবেশে কৃষি এবং স্বয়ংক্রিয় নির্মাণ প্রযুক্তি তৈরি হতে পারে। এসব প্রযুক্তির কিছু পৃথিবীতেও বাণিজ্যিক মূল্য তৈরি করতে পারে।
তবে সরাসরি মঙ্গল-পৃথিবী বাণিজ্য এখনো অত্যন্ত কঠিন। দুই গ্রহের অবস্থানের কারণে উৎক্ষেপণের সুযোগও নির্দিষ্ট সময় পরপর আসে, আর দূরত্ব বিশাল। তাই মঙ্গল থেকে সোনা বা অন্য কোনো সাধারণ খনিজ এনে পৃথিবীতে বিক্রি করে দ্রুত লাভ করার ধারণার চেয়ে স্থানীয়ভাবে সম্পদ ব্যবহার করাই বেশি যৌক্তিক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মঙ্গল বসতি হয়তো শুরুতে একটি ‘ব্যবসা’ না হয়ে একটি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হতে পারে। যেমন পৃথিবীতে একটি শহর বা বন্দর তৈরি করার পর তার অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়, মঙ্গলেও প্রথমে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। পরে সেই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
এমনকি স্পেসএক্সের ২০২৬ সালের করপোরেট পরিকল্পনায় মঙ্গল বসতি ও মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টারের মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও উঠে এসেছে।
তাই অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিচারে মাস্কের মঙ্গল প্রকল্প এখনো অত্যন্ত উচ্চঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। দ্রুত আর্থিক লাভের নিশ্চয়তা নেই।
কিন্তু যদি পরিবহন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে, স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার সম্ভব হয় এবং বসতি ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হতে পারে, তাহলে মঙ্গল একসময় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
অর্থাৎ মঙ্গলের সবচেয়ে বড় ‘রিটার্ন’ হয়তো প্রথমে টাকা হবে না। হতে পারে নতুন প্রযুক্তি, নতুন শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে একটি নতুন অর্থনৈতিক সভ্যতা।
মঙ্গল কি আদৌ লাভজনক হবে?
মঙ্গলে মানুষ পাঠিয়ে সরাসরি লাভ করা এখনো খুব কঠিন। স্পেসএক্সের পরিকল্পনাতেই একটি স্বনির্ভর মঙ্গল শহরের জন্য ১০ লাখের বেশি মানুষ ও কয়েক মিলিয়ন টন কার্গোর কথা বলা হয়েছে। শুরুতে পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও সম্পদ পাঠাতে হবে। তাই প্রথম অর্থনৈতিক লাভ সম্ভবত মঙ্গল থেকে পণ্য বিক্রি করে নয়, বরং স্থানীয় পানি, অক্সিজেন, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে খরচ কমানো থেকে আসতে পারে।
মঙ্গল থেকে সোনা এনে পৃথিবীতে বিক্রি করলেই কি কোটি কোটি ডলার লাভ হবে? বাস্তবে বিষয়টা এত সহজ নয়। পৃথিবী ও মঙ্গলের দূরত্ব, পরিবহন খরচ এবং সীমিত উৎক্ষেপণ সুযোগ বাণিজ্যকে কঠিন করে তুলবে। বরং মঙ্গলের আসল অর্থনৈতিক মূল্য হতে পারে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি, পানি পুনর্ব্যবহার ও শক্তি ব্যবস্থাপনার মতো প্রযুক্তি মঙ্গলে তৈরি হয়ে পৃথিবীতেও ব্যবসায়িক মূল্য তৈরি করতে পারে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি