ফ্রান্সের পরে কি যুক্তরাষ্ট্র?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ফ্রান্স। দেশটির পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ মিল রয়েছে, যা মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করায় ফ্রান্সের ঋণসংকট ঘনীভূত হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সংকট মোকাবিলায় কর বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হলেও রাজনৈতিকভাবে এগুলো অত্যন্ত অজনপ্রিয়। এতে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তা সংকট সমাধানের পথ কঠিন করে তুলেছে।

ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ছে আরও অনেক দেশ। দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, ঋণের অর্থায়নে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংকট মোকাবিলায় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ইত্যাদি এখন পশ্চিমা অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও।

ফ্রান্সের আর্থিক সংকট তীব্র হলেও অন্য দেশগুলোতে তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সরকারি ব্যয়ের অংশও অনেক বেশি। তাছাড়া মার্কিন অর্থনীতির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশটি অদূর ভবিষ্যতে ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়বে, এমন আশঙ্কা নেই।

সংকটের গভীরতা কতটা
ইউরোপের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অসহনীয় ব্যয়ের পথে রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও কয়েকজন রাজনীতিক সতর্ক করে আসছেন, একসময় এই ব্যয়ের বোঝা মেটানোর চাপ তৈরি হবে। তবে পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জি-৭ দেশগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। এতে তা প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ জি-৭ দেশগুলোর সম্মিলিত সরকারি ঋণ তাদের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ-ই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ। দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতিও জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতিবিষয়ক অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবি বলেন, ইউরোপে সরকারি ঋণের বন্ডবাজার ও ঋণ নেওয়ার সুদের হার নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তা করা হলে গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে।

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও আলাদা নয়। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা প্রায় এক বছরের জিডিপির সমান। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশটির বাজেট ঘাটতি ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি। সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এটি দেশটির মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে কর থেকে আদায় করা প্রতি সাত ডলারের এক ডলারই ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।

তবে ইউরোপে সরকারি ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানো নিয়ে যে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে তা হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, তাহলে ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ছে না কেন যুক্তরাষ্ট্র? যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দেশটি বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ‘ডলার’ছাপায়। তেল ও স্বর্ণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসহ বিশ্বের বেশিরভাগ লেনদেন ডলারে সম্পন্ন হয়।

ডলারের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। এর অন্যতম কারণ, ডলারকে নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার দেশটির মুদ্রাকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি করে তুলেছে। যদিও গত এক দশকে ডলারের সেই আকর্ষণ কিছুটা কমেছে।

ফলে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের প্রতিও চাহিদা বজায় রয়েছে। এসব বন্ডকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ডের দরপতন হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদের হার অন্যান্য পশ্চিমা অর্থনীতির তুলনায় কম রয়েছে। গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে দরপতনের সময়ও বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে বন্ডের সুদের হার দ্রুত কমেছে।

ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকৃত পার্থক্য মূলত অর্থনীতির শক্তিতে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বড় ও বহুমুখী। ফলে তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে আকস্মিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেশটির বেশি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক প্রবাহ মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙা রাখছে। ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেশটি সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সক্ষম।