ফ্রান্সের বিক্ষোভের ঢেউ  ইউরোপের দেশে দেশে

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ফ্রান্সে বিক্ষোভ থেকে সৃষ্ট সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে সরকার।

পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আংশিক ও স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারি করা হবে বলে গতকাল সোমবার জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। তবে কোন কোন এলাকায় কারফিউ কার্যকর হবে, তা পরে ঘোষণা করার কথা রয়েছে।

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষক সংকট এবং সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে চলা বিক্ষোভ ও সহিংসতায় গত শনিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে। বিক্ষোভ ঘিরে আহত পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মীর সংখ্যা ৯৯৭। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে এএফপি। গত রোববার সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের প্রতিনিধিদের বিশেষ ক্ষমতা দেন। এর আওতায় প্রয়োজন মনে করলে তাঁরা নির্দিষ্ট কিছু জমায়েত নিষিদ্ধ করতে পারবেন। সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্সেই শহরে সোমবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়।

শুধু ফ্রান্স নয়, বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে। ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিতে বিক্ষোভ হয়েছে। আল-জাজিরা বলছে, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিম্নমানের শিক্ষার প্রতিবাদে আলবেনিয়ায় আবারও রাজপথে নেমেছেন তরুণরা।

ফ্রান্সে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিক্ষক স্বল্পতা, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ পদ্ধতির প্রতিবাদে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরু করেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ কেন্দ্র করে  পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায়ই সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।  শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা। ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে।

বিক্ষোভে সমর্থন রয়েছে ফ্রান্সের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবারের। নিত্যপণ্যের দাম কমানো, পেনশনের অঙ্ক বাড়ানো এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। 

গত মাসেই ফ্রান্সের পথ অনুসরণ করে স্পেন। দেশটিতে আবাসন ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে সেপ্টেম্বরে রাজপথে নেমেছিলেন আন্দোলনকারীরা। একটি বিনিয়োগ তহবিল বাড়ি ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পর ৮৭ বছর বয়সি এক নারীকে তার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনায় বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। মারিকারমেন আবাসকাল নামের ওই নারীকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে দুই সপ্তাহ পর তার মৃত্যু হয়। বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে আবাসন সম্পত্তি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। একই দাবিতে শনিবার পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রস্থলে এদিন শত শত মানুষ সমবেত হন। পর্তুগিজ সরকারের তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে আবাসন সম্পত্তির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) গড় বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ। 

ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিলগুলোর প্রধান ইস্যু ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলটি শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। এ সময় মুখোশধারী দাঙ্গাকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ পুলিশের দিকে পাথর, রাস্তার পেভিং ব্লক ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারে। সেইসঙ্গে বারের টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ রোববার ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। কথিত দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

বিক্ষোভ যেভাবে শুরু
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ পর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে এর পর থেকে বিক্ষোভ ক্রমেই জোরালো হয়েছে, যা শনিবার চূড়ান্ত রূপ নেয়। এই দিন থেকেই ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই বিক্ষোভ চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভের সূত্রপাত।

বিক্ষোভের ফল
গার্ডিয়ান বলছে, বিক্ষোভের পর ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরও ৩ হাজার শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, স্কুলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে সরকার। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ফ্রান্স সরকার। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষা দিতে জরুরি আবাসন আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কংগ্রেসে ডানপন্থি ও কট্টর ডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন সানচেজ। নতুন সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে তার একটি ‘আরও বৃহত্তর প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ প্রয়োজন বলে জনগণকে জানিয়েছেন তিনি।

বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়ে সংকট মোকাবিলায় বৈঠক করবেন। এর পর টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সরকার বিক্ষোভকারীদের আর ছাড় দিতে চায় না বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের বক্তব্যে। তিনি ‘কট্টর বামপন্থি’ বিক্ষোভকারীদের ফ্রান্সজুড়ে ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুরের জন্য দায়ী করেছেন। ২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে নির্বাচন হওয়ার কথা। 

সরকার সংসদের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে অন্তত কিছু আবাসন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনে আগামী নির্বাচনের আগেই বিক্ষোভ কমে আসতে পারে। আগামী মাসের নির্বাচনে জিতলে আরও বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসনসংকট মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও কনজারভেটিভ পিপলস পার্টি।