ইসমাইল আলী, ঢাকা: ‘বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য হলো আমরা কোনো মেগা প্রকল্পে যাব না। মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্যের উন্নতির পেছনে খরচ করতে হবে।’ জাতীয় নির্বাচনের মাস দুয়েক আগে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর এ কথা বলেছিলেন দলটির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপি আয়োজিত ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন। তার আগে ২৫ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কোনো মেগা প্রকল্প বানাবে না, তারা বাংলাদেশের জনগণের স্কিল বাড়ানো, কর্মসংস্থান, আত্মকর্মসংস্থান ও বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেবে।
যদিও ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাসের মধ্যেই প্রথম মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে বিএনপি সরকার। ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন করা হয় পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্পটি। এটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারের তহবিল থেকে যাবে। যদিও এ প্রকল্পের কারিগরি দিক নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সর্বশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষাটি হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর এক যুগ পেরিয়ে গেছে, নদীর গতি পথসহ ইকোসিস্টেমে এসেছে অনেক পরিবর্তন। এই অবস্থায় আগের সমীক্ষার ভিত্তিতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ বাস্তবসম্মত হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে গত মাসে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। এগুলোর নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটি নতুন প্রকল্প, যা এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট নামে পরিচিত। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মেট্রোরেল নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
অপর দুটি মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট) বিগত সরকারের সময় নেওয়া হয়েছিল। সংশোধিত প্রকল্প হিসেবে এ দুটির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা গত মাসে অনুমোদন করে সরকার। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এর আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং পূর্বাচল রুট ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) হবে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ দুই প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ দেবে। যদিও প্রাথমিকভাবে এ দুই প্রকল্পের ব্যয় ছিল অনেক কম। এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এছাড়া এ তিন মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক এ প্রসঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, রাজধানী ঢাকায় যানজট নিরসনের ক্ষেত্রে যেসব প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কাজ করার কথা ছিল, তা সম্পন্ন করা না হলে কেবল মেট্রোরেল দিয়ে ঢাকা শহরের যানজট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বিগত সরকারের আমলে সুপরিকল্পিত কাঠামোর বদলে এলোমেলো উন্নয়ন করা হয়েছে। নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধানের জন্য যেসব ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করা জরুরি ছিল, সেগুলো না করেই ওপরের স্তরের উন্নয়নকাজ চালানো হয়েছে; ফলে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াটিই শক্ত ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন ছাড়া সম্পন্ন করা হয়।
দেশের নগর পরিবহন নীতি ও মেগা প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণে দূরদর্শিতার অভাব তুলে ধরে বিগত সরকারের ভুল নীতিমালার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের মেগা প্রকল্পকেন্দ্রিক নীতির কারণে সাধারণ গণপরিবহন খাত চরম উপেক্ষিত থেকে গেছে। ফলে মেগা প্রকল্পের পেছনে শত শত কোটি ডলার অপচয় না করে আমজনতার যাতায়াত সহজ করতে বাস রুট রেশনালাইজেশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা দ্রুত চালুর আহ্বান জানান তিনি।
পদ্মা ব্যারাজ বা মেট্রোরেলেই শেষ নয় আগামীতে আরও বেশকিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা চলছে। গত ১১ জুন বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন রেলপথসহ বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগ করেছে সেতু বিভাগ।
এদিকে গত ১৩ অক্টোবর সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান জানান, ঢাকার শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ‘কর্ডলাইন’ বা বিকল্প পথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই রেলপথের পুরোটাই হবে উড়াল (এলিভেটেড)। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে চার বছর। এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার এবং যাতায়াতের সময় কমবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।
যদিও এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রেলপথটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বা প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ডলার। অথচ চীনে উচ্চগতির উড়াল রেলপথ নির্মাণে ব্যয় অনেক কম। নিজস্ব প্রযুক্তির কারণে দেশটিতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ পড়ে মাত্র ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ১ কোটি ডলার। ভারতে উড়াল রেলপথ না থাকলেও উড়াল মেট্রোরেল নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৬ কোটি ডলার।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, যেকোনো অর্থনীতিতে মেগা প্রকল্প নেওয়া হবে নাকি ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটি মূল প্রশ্ন নয়; আসল বিষয় হলো যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা থেকে অর্থনীতি সঠিক রিটার্ন পাচ্ছে কিনা। একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়, সেটির বদলে ১০টি কিংবা ১০০টি ছোট প্রকল্প গ্রহণ করা হলে জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতিতে তার অবদান কেমন হতো, তা নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
প্রস্তাবিত কর্ডলাইনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ঢাকা-কুমিল্লা একটি বড় উড়াল রেলপথ নির্মাণের বিপরীতে যদি গ্রামগঞ্জের অগণিত ভাঙাচোরা রাস্তা মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া যায়— যেখানে বড় গর্তের কারণে গাড়ি ভেঙে যায়, রিকশা আটকে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ আহত হয়— তবে সেই মেরামত প্রকল্পের সুফল সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছায়। এ ধরনের ১০০টি গ্রামীণ সড়ক সংস্কার প্রকল্পের মাধ্যমে যাতায়াত ব্যবস্থা সচল করে অর্থনীতিতে যে অবদান রাখা সম্ভব, একটি মেগা প্রকল্পের অবদান যদি তার চেয়ে বেশি হয়, তবেই মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক হবে।
কারিগরি ও অর্থনৈতিক পরিভাষায় ব্যয়ের সুফল বিশ্লেষণে খরচের তুলনায় লাভের পাল্লা ভারী হলেই কেবল সেই পথে হাঁটা উচিত। তবে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মেগা প্রকল্পের যৌক্তিকতা বিচারের ক্ষেত্রে ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণের চেয়েও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের পক্ষ থেকে ঋণ হিসেবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অবশিষ্ট প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থান সরকারকেই করতে হবে। এমন এক সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যখন অর্থনীতিতে তীব্র আর্থিক টানাপড়েন বিদ্যমান; সরকারি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে অথচ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি স্পষ্ট ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে ঋণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া জাতীয় বাজেটে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ একটি বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যে কোনো বড় প্রকল্পের কাজ ১০ শতাংশ বা আংশিক শুরু করার পর যদি দেখা যায় অর্থাভাবে সেটি মাঝপথে আটকে গেছে, তবে তা অর্থনীতির জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে যদি ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর আর্থিক টানাটানিতে কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তবে সেই বিনিয়োগ থেকে কোনো সুফলই পাওয়া যায় না, যার ফলে ‘আমও গেল, ছালাও গেল’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অথচ ওই একই ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে দেশের গ্রামীণ সড়কগুলো সংস্কার করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতিতে সুফল মিলত, যার জন্য ১০ বছর বা তার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো না।
এদিকে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দরকষাকষিতে দেশের নিজস্ব সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী হলেও, তাদের প্রস্তাব বা চাহিদার ওপর অন্ধ নির্ভরতার কালচার থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা মেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণ করে ধীরগতিতে কাজ চালায় এবং পরবর্তী সময়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে চায় না। আমলাতন্ত্র ও মন্ত্রণালয়ের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বিমানবন্দর টার্মিনালসহ অন্যান্য প্রকল্পে জটিলতা তৈরির অজুহাত দেখিয়ে সরকারকে সুবিধাজনক দরকষাকষির অবস্থান থেকে সরিয়ে এনেছে। এতে দাতা সংস্থাকে মনোকষ্ট দেওয়ার ভয়ে জিম্মি হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পের ভারী ঋণ পরিশোধ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল বোঝা সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়।
ড. শামসুল হক জানান, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক টানাপড়েনের পর বর্তমান সরকারের পারফরম্যান্স ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দূরদর্শিতা সাধারণ মানুষ গভীরভাবে মূল্যায়ন করবে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কিংবা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির বদলে ধাপে ধাপে নিয়ম মেনে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে জোর দিতে হবে।