সরকার বলছে সমৃদ্ধি, আইএমএফের হিসাবে সংকট! কোন পথে বাংলাদেশ? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

একদিকে আগামী পাঁচ বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য। অন্যদিকে, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে কি মিলছে বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র?

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, আগামী কয়েক বছরেও প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছে না সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ, দুর্বল কর্মসংস্থান, বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং জ্বালানি ঘাটতি-সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, সরকারের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্ক পূর্বাভাসের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন? অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী চাপ আরও বাড়বে? আর এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা পড়তে পারে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এখন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। সরকারের পরিকল্পনা আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের পাঁচ বছরের সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

এই পূর্বাভাস সত্যি হলে প্রায় ৩৯ বছরের মধ্যে এটি হবে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আনুমানিক ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

শুধু আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংকও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির পূর্বাভাস ৪ শতাংশ।

তবে সরকারের হিসাব ভিন্ন। পরিকল্পনা কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশ, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে সাড়ে ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

অর্থাৎ, একদিকে সরকার দ্রুত প্রবৃদ্ধি বাড়ার প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে আইএমএফ আগামী কয়েক বছরও নিম্ন প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা করছে।

আইএমএফের পূর্বাভাসে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে আগামী কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধির চিত্র।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ২ দশমিক ২ শতাংশে। এর আগে ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরেও বাংলাদেশে একই হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, সরকারের পরিকল্পনায় যেখানে আগামী পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে, সেখানে আইএমএফের পূর্বাভাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক নিচে থাকার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের পূর্বাভাসের কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ পূর্বাভাস নিয়ে সরাসরি বিতর্কে যেতে চাননি। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সময়, ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, সংস্থাগুলো তাদের পূর্বাভাস দিয়েছে। সরকারের বাজেটে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ চলছে।

এর আগে ৬ অক্টোবর পূর্বাভাস সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে অর্থনীতির কোন জায়গাগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন প্রয়োজন?

অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম মূল্যস্ফীতি। প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি হতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে পারে দেশ।

অথচ সরকারের লক্ষ্য, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে সীমিত রাখা। বাস্তবে গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকও চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য থাকলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে স্বস্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

টানা চার বছর ধরে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। আয় একই হারে না বাড়লে বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে কর্মসংস্থানের দুর্বলতা যুক্ত হলে পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের দুর্বলতার কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্যের ওপরও।

তাই মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়, পরিবারের জীবনযাত্রা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকগুলোর একটি হলো দারিদ্র্য বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত চার বছরে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।

২০২২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরে এই হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে উদ্বেগের বিষয় হলো, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হলে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে আর্থিক চাপ সামলে ওঠা আরও কঠিন হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই পুনরুদ্ধার এখনো প্রত্যাশিতভাবে দৃশ্যমান হয়নি।

অর্থাৎ, শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতি না হলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকির তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ব্যাংকিং খাত। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি-দুই সংস্থাই এই খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।

খাতভিত্তিক হিসাবে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমে মাইনাস ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

এডিবির পর্যবেক্ষণেও ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যালেন্স শিট, সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগের প্রবণতা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যায় পড়ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চড়া সুদ, ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। সরকারি বিনিয়োগও কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।

বিদেশি বিনিয়োগেও দেখা গেছে নেতিবাচক প্রবণতা। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৫ শতাংশ।

এই পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, বিনিয়োগ দুর্বল হলে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ফলে ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ঋণ, ব্যবসা, উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও প্রভাব ফেলে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

একসময়, ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেল আমদানিতেও সরকারকে বাড়তি কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।

এদিকে লজিস্টিকসের জটিলতা এবং দীর্ঘ নিয়ন্ত্রক ও প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রক্রিয়াও নতুন বিনিয়োগের পথে বাধা তৈরি করছে।

অর্থনীতির আরেকটি দুর্বল জায়গা রাজস্ব আদায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস-জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

রপ্তানি খাতেও রয়েছে চাপ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পণ্য ও সেবা খাতের রপ্তানি আগের তুলনায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শ্রম রপ্তানিতেও বাধা সৃষ্টি করছে।

অর্থাৎ, একদিকে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে বিনিয়োগের ধীরগতি ও রাজস্ব ঘাটতি-সব মিলিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত একই সময়ে চাপের মুখে রয়েছে।

এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরাও। তাদের মতে, প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনীতি যেভাবে চলছে, তাতে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি মনে করেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে দেশের কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে, সামনে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে। মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দারিদ্র্য বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেছেন, আইএমএফের পূর্বাভাসকে একটি ‘বেসলাইন সিনারিও’ বা ন্যূনতম পরিস্থিতির চিত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার মতে, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক ও নীতিগত কাঠামোয় মৌলিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশ আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত কর্মসংস্থানের একটি জটিল ফাঁদে আটকে পড়েছে।

তার সতর্কবার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ যে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছিল, তা এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই বিপজ্জনক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব।

অর্থাৎ, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয় নয়। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগের পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন-সব ক্ষেত্রেই কার্যকর পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। সরকারের লক্ষ্য উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া। কিন্তু আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র।

চলতি অর্থবছরে সরকার যেখানে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে আইএমএফের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংকের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগে পতন, জ্বালানি সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি।

এই সূচকগুলো দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বাংলাদেশের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আর এসব চ্যালেঞ্জের প্রভাব শুধু জাতীয় প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; তা কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসই বাংলাদেশের অর্থনীতির চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নয়। এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতির একটি হিসাব। বাস্তবে অর্থনীতি কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে বিদ্যমান দুর্বলতা মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর।

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো, বিনিয়োগের বাধা কমানো, রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতি এবং সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশ কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়াতে পারবে? নাকি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম বিনিয়োগ ও বাড়তে থাকা দারিদ্র্যের চাপ আরও দীর্ঘ হবে?

সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্ক পূর্বাভাসের মধ্যকার ব্যবধান কমানোই এখন বড় পরীক্ষা।

সমৃদ্ধির স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সেই স্বপ্নের সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তবতার মিল ঘটাতে হবে। আর সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশ কতটা সফল হয়, তা নির্ধারণ করবে দেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক পথচলা।

দেখার বিষয়, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়, নাকি অর্থনৈতিক হতাশার ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতেই দীর্ঘ সময় ব্যয় করে।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি