ঢাকার খেলার মাঠে বাজার, গ্যারেজ ও দখল,  ব্যাহত শিশুদের খেলাধুলা (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

ইট-পাথরের এই শহরে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ আর খেলাধুলার জায়গা কোথায়? মাঠ থাকলেও অবাধে খেলার সুযোগ মিলছে না অনেক এলাকায়।  যে মাঠে শিশুদের হাসি-আনন্দে মুখর থাকার কথা, সেখানেই কোথাও ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ, কোথাও গাড়ির গ্যারেজ, আবার কোথাও বাজার-মেলা। ফলে মাঠ থাকলেও খেলাধুলার সুযোগ সীমিত। কাগজে-কলমে ঢাকায় খেলার মাঠ ২৩৫, উন্মুক্ত মাত্র ২৪টি।

রাজধানীতে খেলার মাঠ আছে ২৩৫টি, তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক কলোনি ও বিভিন্ন সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকায় অধিকাংশ মাঠে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। দুই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব খেলার মাঠ মাত্র ২৪টি। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত কোনো খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে উত্তরের ১০টি এবং দক্ষিণের ৩১টি ওয়ার্ড রয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ২৩৫টি মাঠের মধ্যে ১৪১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, ২৪টি আবাসিক কলোনির এবং ১২টি ঈদগাহ মাঠ। প্রতিবেদনে ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে দখল হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত মাঠের সংখ্যা বলা হয়েছে ৪২টি।

তবে উন্মুক্ত হিসেবে পরিচিত অনেক মাঠেও রয়েছে ব্যবহারের বাধা। কোথাও ক্লাবের ভবন, কোথাও গাড়ির গ্যারেজ, আবার কোথাও বাজার ও মেলার কারণে নিয়মিত খেলাধুলা ব্যাহত হচ্ছে।

ঢাকার প্রায় ৩০৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিবেচনায় অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠের প্রয়োজন বলে নগর-পরিকল্পনাবিষয়ক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ড্যাপের খসড়া অনুযায়ী প্রতি ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য একটি মাঠ প্রয়োজন। দুই সিটির প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ জনসংখ্যার হিসাবে মাঠের প্রয়োজন প্রায় দেড় হাজার।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরের ১০টি ও দক্ষিণের ৩১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ সীমিত করে। তবে কিশোর অপরাধ বা মাদকাসক্তির একমাত্র কারণ মাঠের ঘাটতি নয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, মাঠ দখলের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে। এ কারণে উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মাঠ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রম এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শিশুর  বিকাশের অন্যতম মাধ্যম খেলাধুলা, তাই মাঠের এই সমস্যা সমাধানে  আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দুই সিটির ১৩০টি মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০টি মাঠ রয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতি দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডের জন্য অন্তত একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, মাঠে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের সংকট নগর ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের দুর্বলতা তুলে ধরে। তার মতে, সরকারের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।

রাজধানীতে মাঠের সংকট কাটাতে শুধু মাঠ উদ্ধার নয়, নিশ্চিত করতে হবে সবার প্রবেশাধিকারও। মাঠগুলো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে খেলাধুলার জায়গা হয়ে উঠবে-এমন প্রত্যাশাই নগরবাসীর।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি