জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার একটি ইসরায়েলি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন মধ্যস্থতায় রিয়াদের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা সত্ত্বেও সৌদি আরব এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয় বলে গত সোমবার ইসরায়েলি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। খবর আনাদোলুর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে এমন সহযোগিতা সৌদি জনগণের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে— এই আশঙ্কা থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। অন্য একটি সূত্র জানায়, এর মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করে ভবিষ্যতে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির পথ সুগম করতে চেয়েছিল ইসরায়েল। সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। রিয়াদ বলে আসছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ স্থায়ী সমাধানের ওপরই এটি নির্ভর করছে।
এদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হওয়া গৃহযুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব। এর জবাবে গত এক সপ্তাহ ধরে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে হুতিরা। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা হয়। এতে আগুন লাগে। তবে আগুনের ব্যাপ্তি ছিল সীমিত। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানায়। মন্ত্রণালয় জানায়, কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
আরামকোর একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, দাহরানে কোম্পানিটির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি অফিস টাওয়ারে লাগে। এতে টাওয়ারটির ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন আরও দুজন জানান, ভবনটিতে আগুন জ্বলছিল। কমপ্লেক্সটিতে আরামকোর একটি বড় পরিচালনকেন্দ্র রয়েছে। এর আগে ছয়টি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, তারা আরামকোর কমপ্লেক্সের কাছে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন।
সৌদির নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা দাহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে। এর ধ্বংসাবশেষ একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। জোট এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
বুধবার সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানায়, হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আটকে ধ্বংস করা হয়। সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ রিয়াদে পড়ে। এতে চারজন আহত হন। তাদের মধ্যে দুজন নারী, একজন পুরুষ ও একটি শিশু। ধ্বংসাবশেষের আঘাতে রাজধানীর ১৫টি বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল হুতিরা। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছিলেন, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে দাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর ও রিয়াদের একটি তেল শোধনাগার থাকতে পারে।
রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ পর্যন্ত চার দফা হামলা হয়েছে। গত শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। গত এক দশকে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং আরও ১১ জন আহত হন। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। এরপর আরও হামলার কারণে দেশজুড়ে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন নিয়ে নতুন করে ভাবছেন আয়োজকরা। চলতি মাসের শেষে ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন অন্তত দুজন রয়টার্সকে জানান, নির্বাহীদের সরাসরি অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। একজন জানান, সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের অনেকে রাজধানীর বাইরের কোনো বিমানঘাঁটি কিংবা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশে নেমে সড়কপথে রিয়াদে যেতে চাইছেন। সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের কাছে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলে তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি।
শনিবারের হামলার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী মাহা আল সৌদ ও নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান রিচার্ড আতিয়াস বলেন, ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভের দশম আসরে রিয়াদে হাজারো প্রতিনিধিকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা আর সুস্থতা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ রয়টার্স জানায়, গত সোমবার একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে বড় কয়েকটি তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা নাম প্রত্যাহার করেছেন।
জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা তুলে ধরতেই এ সম্মেলন হয়। বিভিন্ন দেশের নেতা-মন্ত্রী, করপোরেট শীর্ষ নির্বাহী ও আর্থিক খাতের প্রভাবশালীরা এতে অংশ নেন। তাই এটি ‘মরুভূমির দাভোস’ নামে পরিচিত।