মোহাম্মদ সুমন: আশ্রয়শিবিরের পাহাড়ি ঢালে ঝুঁকি যত বাড়ছে, মানবিক সহায়তার হাত তত ছোট হচ্ছে। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সেনা অভিযানের মুখে যারা সীমান্ত পেরিয়েছিল, তাদের সন্তানদের অনেকের জন্ম হয়েছে এই শিবিরেই। সেই শিশুরা বড় হচ্ছে বাঁশের বেড়া আর কাদামাখা পথের মধ্যে। যে দেশ তারা কখনও দেখেনি, সেই দেশের নাগরিকত্ব তাদের নেই। আর যে দেশে তারা আছে, সেখানে তাদের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়েও কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার জোটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজার এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু এবং ক্যাম্পে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজারের বেশি নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে। ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআরসহ মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাবে, অন্তত ৬ লাখ ২৪ হাজার শিশুর জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা, সবকিছুর জন্যই এই শিশুরা আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সেই সহায়তার পরিমাণ কমে এলে প্রথম ধাক্কা লাগে তাদের গায়েই।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তীব্র অপুষ্টি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়েছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি হয়েছিল ৮৩৬ জন, পরের বছর সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২ জনে। চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীসহ মোট ১৩ লাখ মানুষের কাছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষামূলক জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য ১০৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের জরুরি মানবিক তহবিলের আবেদন জানিয়েছে ইউনিসেফ।
এ বছরের শুরু থেকে জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা বিশেষায়িত পুষ্টি খাত থেকে সরিয়ে সাধারণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নেওয়া হয়েছে। এর পর জটিল অপুষ্টির শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি হঠাৎ কমে যাওয়ায় ইউনিসেফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রশ্নটা তাই সোজা: ভর্তি কমেছে কারণ শিশুরা সুস্থ হয়েছে, নাকি ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা শনাক্তই হচ্ছে না?
অপুষ্টি শুধু শরীর শীর্ণ করে না। জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে পুষ্টির ঘাটতি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার সামর্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। তাই আজকের ক্ষুধার মূল্য শিশুটি শোধ করে ভবিষ্যতে, শ্রেণিকক্ষে ও কর্মজীবনে। এছাড়া ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সাহায্য ও যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) তহবিল কমে যাওয়ার কারণে রেশন প্রতি ব্যক্তি মাসে ১২ ডলার থেকে কমিয়ে মাত্র ৭ ডলারে নামানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিশুদের ওপর।
এর ওপর আছে পাহাড়ের ঝুঁকি। বর্ষায় ঢল, ভূমিধস আর জলাবদ্ধতা শিবিরের জীবনকে বারবার নাড়া দেয়। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতিতে ঢালের মাটি আলগা হয়ে যায়, ঘর ভাঙে, পথ বন্ধ হয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ে, আর সেখান থেকেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি। অর্থাৎ দুর্যোগ ও রোগ এখানে আলাদা সমস্যা নয়, একটি আরেকটিকে টেনে আনে।
শৈশবের সংকট কেবল শরীরের নয়। শিক্ষা এখানে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা। শিবিরে শিশুদের জন্য লার্নিং সেন্টার আছে, কিন্তু সেগুলো সব শিশুর জন্য যথেষ্ট নয় এবং প্রচলিত অর্থে স্কুলও নয়। চিকিৎসা ও পুষ্টির কাজ চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় বাধা এখন অর্থ। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, কক্সবাজারের স্বাস্থ্য খাতের সমন্বয় ও নেতৃত্বের জন্য তাদের চাহিদার ৬৪ শতাংশ অর্থ ঘাটতি রয়েছে। এর অর্থ হলো, রোগ নজরদারি, প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যকার সমন্বয় দুর্বল হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট এখন এক দশকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফেরত যাওয়ার নিরাপদ পরিস্থিতি মিয়ানমারে তৈরি হয়নি, আর আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে সরে যাচ্ছে বলে মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা। এই বাস্তবতায় একটি শিশুর শৈশব কেটে যাচ্ছে হিসাবের খাতায়, অর্থ বরাদ্দের সময়সীমা আর কর্মসূচির মেয়াদের মধ্যে। সরকার, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। অপুষ্টি আর রোগের চিকিৎসা, স্কুলের সুযোগ আর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দাতব্য নয়, নিয়মিত ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন; তা না হলে এই শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়