দৃষ্টিশক্তি ফেরাতে চোখে চিপ বসালেন বিজ্ঞানীরা

প্রযুক্তি ডেস্ক: বংশগত জটিল চোখের রোগে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে সাফল্য অর্জন করেছেন বিজ্ঞানীরা। আমেরিকার নিউরোটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান ‘সায়েন্স করপোরেশন’ প্রথমবারের মতো স্টারগার্ড রোগে আক্রান্ত এক রোগীর চোখের রেটিনায় দৃষ্টি সহায়ক বিশেষ এক চিপ সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছে। ‘টেকক্রাঞ্চ ডিসরাপ্ট’-এ অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও নিউরালিংকের সাবেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ম্যাক্স হোডাক এই ঐতিহাসিক অর্জনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন।

স্টারগার্ড একটি বিরল ও মারাত্মক বংশগত চোখের রোগ, যা ধীরে ধীরে মানুষের চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। এই রোগে চোখের আলো সংবেদনশীল কোষগুলো মরে যায় এবং চোখের দৃষ্টিসীমার ঠিক মাঝখানে একটি বড় অন্ধবিন্দু তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে থাকে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এই জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এতদিন এই রোগের স্থায়ী কোনো নিরাময় ছিল না।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি আই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর চোখে গত মে মাসে ‘প্রাইমা’ নামের এই মাইক্রোচিপটি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর চোখের নষ্ট হয়ে যাওয়া রেটিনার পেছনের অংশে মাত্র ২ মিলিমিটার আকারের চিপটি বসানো হয়। চিকিৎসকরা জানান, রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বেই ওই রোগী একটি বর্ণ বা অক্ষর দেখতে সক্ষম হন এবং দ্বিতীয় সেশনেই তিনি একটি পুরো শব্দ পড়তে পেরেছেন।

চিকিৎসা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি বেশ অভিনব। চোখে চিপ প্রতিস্থাপনের পর রোগীকে ক্যামেরা যুক্ত একটি বিশেষ চশমা পরতে দেওয়া হয়। চশমার ক্যামেরাটি সামনের জগতের দৃশ্য ধারণ করে সংকেত আকারে চোখের ভেতরের চিপটিতে পাঠায়। চিপটি কৃত্রিম আলো সংবেদনশীল কোষ হিসেবে কাজ করে চোখের অপটিক নার্ভকে সক্রিয় করে তোলে। সেই স্নায়বিক সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছালে রোগী সাদা-কালো কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট হাই-কন্ট্রাস্ট ছবি দেখতে পান। চিপটির আকার ছোট হওয়ায় আপাতত এটি দিয়ে সুচের ছিদ্র দিয়ে দেখার মতো অল্প পরিসরে অক্ষর বা বস্তু দেখা সম্ভব হচ্ছে।

ম্যাক্স হোডাক জানান, মানুষের মস্তিষ্ক একটি কম্পিউটারের মতো এবং দৃষ্টিশক্তি হলো এক ধরনের বৈদ্যুতিক প্রবাহ। অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সঠিক বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠানো সম্ভব হলে হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মানুষের রেটিনা মূলত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রেরই একটি অংশ। তাই এই রিটিনাল প্রস্থেসিস বা কৃত্রিম রেটিনাকে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) প্রযুক্তিরই একটি বড় অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

ইউরোপে ইতোমধ্যেই বয়সের কারণে রেটিনা ক্ষয়ে যাওয়া (জিএ) রোগীদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বাণিজ্যিক অনুমতি রয়েছে। তবে এবার এটি স্টারগার্ডের মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, পরবর্তী প্রজন্মের চিপে ইলেকট্রোডগুলোর আকার আরও ছোট করা হবে এবং চোখের বাঁকানো গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিপের পরিধি বাড়ানো হবে, যাতে মানুষের স্বাভাবিক চোখ দিয়ে দেখার মতো বিস্তৃত ও নিখুঁত দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হয়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একদম প্রাকৃতিকের কাছাকাছি দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তারা।

সায়েন্স করপোরেশন শুধু চোখের চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নিউরালিংক যেমন সরাসরি মস্তিষ্কের টিস্যুর ভেতরে সেন্সর বসায়, সায়েন্স করপোরেশন তাদের প্রযুক্তি মাথার খুলির নিচে কিন্তু মস্তিষ্কের ওপরের অংশে স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ব্রেন স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা, নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ নিরাময় এবং স্ট্রোকের কারণে হারিয়ে যাওয়া মস্তিষ্কের অংশকে আবার সক্রিয় করে তোলার মতো বৈপ্লবিক চিকিৎসা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মস্তিষ্ক ও শরীরকে সুস্থ রাখার লক্ষ্যে পরিচালিত এই গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।